হুমায়ূন আহমেদ | এমএসইউতে একটি সন্ধ্যার বাংলাদেশ, হুমায়ূন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করেছিলেন। ‘বাংলাদেশ নাইট’ নিয়ে একটা অংশ আছে তাঁর হোটেল গ্রেভার ইন বইতে। নানা দেশের ছাত্রছাত্রী পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে । কোনো একটি দেশের শিক্ষার্থীরা মিলে যখন নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য তুলে ধরার জন্য একটা অনুষ্ঠান করে, একসঙ্গে একটা সুন্দর সন্ধ্যা কাটায়, সেটাকেই বলা হয় সে দেশের নামে ‘নাইট’ উদ্যাপন।
হুমায়ূন আহমেদ | এমএসইউতে একটি সন্ধ্যার বাংলাদেশ

ছোটবেলায় হুমায়ূন আহমেদের এই লেখাটা পড়েছি। আমারও যে একদিন ‘বাংলাদেশ নাইট’ উদ্যাপনের অভিজ্ঞতা হবে, কল্পনাও করিনি। কিন্তু হলো! যুক্তরাষ্ট্রে মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে (এমএসইউ) এ বছর বাংলাদেশ নাইট হয়ে গেল গত ২৬ মার্চ, আর এখানকার ছাত্রী হিসেবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম আমি। ফ্যাশন শোতে বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় চরিত্রগুলোকে হাজির করেছিলাম আমরা। শুনে সহজ মনে হলেও আসলে কাজটা ছিল কঠিন। কারণ, বাংলাদেশ নাইটের মূল দর্শক মূলত বিদেশিরা। এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ। সাংস্কৃতিক অংশটাই এসব অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ। সেটার তোড়জোড় আগেভাগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। গান, নাচ, আবৃত্তি—কোনোটির জন্যই শিল্পীর অভাব হয়নি। তবে সবচেয়ে দারুণ আর অন্য রকম ছিল দুটো আয়োজন—ফ্যাশন শো আর নাটিকা।
প্রথমেই চরিত্র বাছাই হলো—দেবদাস-পার্বতী, অমিত-লাবণ্য, টুনি-মন্তু, হিমু-রূপা, বাকের-মুনা। তিন গোয়েন্দা আর রানা-সোহানাকেও আমরা বাদ দিইনি। চরিত্রের বাস্তব সংস্করণ এখানে খুঁজে বের করতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। অনেকেই এগিয়ে এলেন বলে কাজটা সহজ হলো। কোনো চরিত্র মঞ্চে উঠলে সে কে, কোন উপন্যাসের চরিত্র, কাহিনির সারমর্ম কী, কাহিনিতে এই চরিত্রের ভূমিকাই–বা কী—ধারাভাষ্যে এক-দেড় মিনিটে পুরো ব্যাপারটা আমাদের বোঝাতে হয়েছে। খানিকটা গর্ব নিয়েই বলছি, ধারাভাষ্য লেখার দায়িত্ব পেয়ে আমি শেষ পর্যন্ত উতরে গিয়েছি।

ধারাভাষ্যের সঙ্গে চরিত্রগুলো স্রেফ মঞ্চে হেঁটে বেড়ালেই চলবে না। অতএব, কিছু দৃশ্যও সাজাতে হলো। সেই দৃশ্যের সঙ্গে মিলিয়ে অভিনয়, পেছনের পর্দায় প্রদর্শনের জন্য বইয়ের নাম অনুবাদ করে স্লাইড তৈরি, আবহ সংগীত জোগাড়, মঞ্চের আলো নিয়ন্ত্রণ—কত কাজ! পুরো ব্যাপারটা সামাল দেওয়া একসময় কঠিন মনে হচ্ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক একটা মঞ্চে নিজের দেশকে তুলে ধরতে গিয়ে সবাই যখন নিজের সেরাটাই দিলেন, তখন আর ভাবতে হয়নি। ফ্যাশন শোর অংশটা দর্শক দারুণ পছন্দ করেছে। বিদেশি বন্ধুদের অনেকেই বইগুলোর ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে অনুষ্ঠান শেষে জানতে চাচ্ছিল, এগুলোর অনূদিত গ্রন্থ আছে কি না।
বাংলাদেশ নাইটের প্রতিটি আয়োজনেই আমরা দেশকে তুলে ধরতে চেয়েছি। গান-কবিতা-নাটক—যেটাই মঞ্চে চলুক, ভিনদেশি দর্শকদের বোঝার সুবিধার্থে সঙ্গে ইংরেজি অনুবাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁরাও বুঝতে চেয়েছে। শিশু থেকে বুড়ো—সবাই মন দিয়ে দেখেছে, হেসেছে, তালি দিয়েছে। কুইজে অংশ নিয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। অনুষ্ঠান শেষে ভিনদেশিরা বাংলাদেশি বন্ধুদের জানিয়েছে, কতটা ভালো লেগেছে তাদের এই আয়োজন। অনেক কিছু দেখেই অবাক হয়ে গেছে তারা। এমনকি আমাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে তারাও মুগ্ধ হয়ে শুনেছে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’

আয়োজনের দায়িত্বে ছিল বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএ) নির্বাহী কমিটি। স্পনসর খোঁজা, বাজেট তৈরি, ভেন্যু ঠিক করা, অতিথিদের জন্য বিনা মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা—এমন হাজারো খুঁটিনাটি দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া কম ঝক্কির কাজ না! । মাত্র দুজন মিলে ‘বাংলাদেশ নাইট’ উদ্যাপন করতে গিয়ে সে সময় হুমায়ূন আহমেদ হিমশিম খেয়েছিলেন। এখনকার অবস্থা সে রকম নয়। এমএসইউতে অনার্স-মাস্টার্স-পিএইচডি মিলিয়ে বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৬০। আবার তাঁদের অনেকের স্বামী বা স্ত্রী, বাচ্চাকাচ্চা মিলে রীতিমতো একটা কমিউনিটি। কোভিডের কারণে গত দুই বছর বাংলাদেশ নাইট আয়োজন করা হয়নি। এর মধ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। তাই এবার শুরু থেকেই ছিল ব্যাপক উৎসাহ–উদ্দীপনা।
নাটিকা অংশটা ছিল আরও মজার। বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী একটা বিয়ে কীভাবে হয়, পুরোটাই আমরা দেখিয়েছি অভিনয় করে। অর্থাৎ ঘটক আসা, পাত্র-পাত্রী দেখা, গায়েহলুদের নাচগান, বিয়ের দিন মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরে কনের কান্না, বাদ ছিল না কিছুই! সাজসজ্জার দায়িত্বে ছিল যে দলটা, তাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। কারণ, হলুদের মালা–ডালা-কুলা থেকে শুরু করে আস্ত এক পালকির কাটআউটও তৈরি করতে হয়েছিল! মাত্র বারো মিনিটের নাটিকায় পাত্র–পাত্রীসহ সবাই মিলে হাস্যরস থেকে শুরু করে মিষ্টি প্রেম, ছলছল চোখ, সবই তুলে এনেছেন। দেশি-বিদেশি সবার কাছেই যে আয়োজনটা ভালো লেগেছে, সেটা তুমুল করতালি শুনেই বোঝা যাচ্ছিল।
সুন্দর সুন্দর প্রোমো বানিয়ে এমএসইউএর অ-বাংলাদেশি সব ছাত্র–শিক্ষককেই আহ্বান করা হয়েছিল বাংলাদেশ নাইটে। সব মিলিয়ে দুই শর মতো অতিথি নিয়ে নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠান শুরু হয় বিকেল ৫টায়। শুরুতেই ছিল জাতীয় সংগীত আর বাংলাদেশের ওপর বানানো ছোট তথ্যচিত্র। এরপর একক, দ্বৈত, দলীয় নৃত্য আর গান, ফ্যাশন শো, নাটিকা, ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ আবৃত্তির ফাঁকে ফাঁকে বিদেশিদের জন্য ছিল পুরস্কারসহ টাং টুইস্টার আর কুইজ। কীভাবে যে ২ ঘণ্টা ১০ মিনিট কেটে গেছে, কেউ বুঝতেই পারিনি। অনুষ্ঠানের শেষে ছিল বাংলাদেশি ক্যাটারিং থেকে আনা খাবার—খাসির তেহারি, সবজি বিরিয়ানি, মুরগি, ছোলার ডাল, টিকিয়া, ডিম ভুনা আর শেষে মিষ্টি। খাও যত পারো!
