হাসান আজিজুল হক: বাংলা সাহিত্যের দীপ্তিমান আলো

বাংলা কথাসাহিত্যে যাঁরা নিভৃত অথচ গভীর আলো জ্বেলে গেছেন, তাঁদের মধ্যে হাসান আজিজুল হক একজন অমোঘ প্রতিভা। মানব জীবনের সংগ্রাম, সমাজের প্রান্তিক মানুষের নীরব আর্তি, ক্ষুধা ও প্রেম—সবই তাঁর গল্প ও উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য। ষাটের দশকে সাহিত্যাঙ্গনে আবির্ভূত এই কথাসাহিত্যিক সংহত গদ্য, নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি ও মর্মস্পর্শী বর্ণনাভঙ্গির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র উচ্চতা অর্জন করেন।

সাহিত্য ও বৈশিষ্ট্য

হাসান আজিজুল হকের সাহিত্য কোনো অলংকারপ্রবণ সৌন্দর্যচর্চা নয়; এটি জীবনের রুক্ষ বাস্তবতার দলিল। রাঢ়বঙ্গের শুষ্ক প্রকৃতি, খরখরে মাটি, অভাবী মানুষের নিরেট জীবনচিত্র তাঁর গল্পের পটভূমি। জীবনের দুঃখ, ক্ষোভ, অস্তিত্বসংকট—সবই তিনি নিখুঁত বাস্তবচিত্রের মাধ্যমে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্প ও উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে—

গল্প/উপন্যাসপ্রকাশকালবিষয়বস্তু সংক্ষেপ
শকুন১৯৬০-এর দশকগ্রামের তলদেশ ও সুদখোর মহাজনের গল্প
তৃষ্ণা১৯৬০-৭০মানবিক তৃষ্ণা ও জীবনের আকাঙ্ক্ষা
উত্তরবসন্তে১৯৭০প্রেম ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ফেরা১৯৮০বাস্তবিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও যাপন
আগুনপাখি (উপন্যাস)২০০৬দেশভাগ, নারীর সংগ্রাম ও ইতিহাসের নীরব বেদনা

জীবন ও শিক্ষা

হাসান আজিজুল হক জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে। পিতা মোহাম্মদ দোয়া বখশ ও মাতা জোহরা খাতুন। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন কৃতী ছাত্র; ১৯৫৮ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক এবং ১৯৬০ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। দর্শনের যুক্তিবোধ ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর সাহিত্যচিন্তায় সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

১৯৬০ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে ৩১ বছর শিক্ষকতার মাধ্যমে অসামান্য অবদান রাখেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন সংবেদনশীল, প্রজ্ঞাবান ও ছাত্রবান্ধব।

স্বীকৃতি ও পুরস্কার

পুরস্কার/সম্মানবছর
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার১৯৭০
একুশে পদক, বাংলাদেশ সরকার১৯৯৯
সম্মানসূচক ডি.লিট, অসম বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত২০১২

শেষদিন ও স্মৃতি

হাসান আজিজুল হক ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহীতে ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম মানুষের জীবনসংগ্রামের যে অনন্ত কথকতা ধারণ করেছে, তা বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘদিন আলো জ্বালাবে। তাঁর গল্প ও উপন্যাস এখনো পাঠককে প্রজ্ঞা ও সংবেদনায় অনুপ্রাণিত করে।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।