হামের প্রকোপ বেড়ে ১১ দিনে ভর্তি ১০৫, মৃত্যু তিন শিশুর

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হাম (মিসেলস)-এ আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা। গত ১১ দিনে ১০৫ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে, যার মধ্যে তিনজনের মৃত্যু ঘটেছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন এবং পৃথক চিকিৎসা কর্নার চালু করলেও রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।

চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করলে ২৪ মার্চ হাসপাতাল প্রশাসন তিনটি পৃথক মেডিকেল টিম গঠন করে। শিশু ওয়ার্ডে ‘হাম/মিসেলস কর্নার’ নামে ১০ শয্যাবিশিষ্ট তিনটি আলাদা কক্ষ নির্ধারণ করা হয়। তবে বাস্তবে রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে নির্ধারিত কক্ষগুলোতে জায়গা হচ্ছে না; ফলে অনেক ক্ষেত্রে এক বিছানায় দুই শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে এবং অন্য সাধারণ রোগীদের সঙ্গেও হাম আক্রান্তদের রাখতে হচ্ছে, যা সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

শনিবার বিকেল পর্যন্ত শিশু বিভাগের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে ৪৬ জন এবং ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের দুটি ইউনিটে ২৩ জন শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। অথচ এই দুই ওয়ার্ডে মোট শয্যা রয়েছে মাত্র ৬০টি, যেখানে প্রায়ই ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী ভর্তি থাকে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। ময়মনসিংহ ছাড়াও শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, কুড়িগ্রাম, কিশোরগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা এখানে আসছে।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ মার্চ থেকে আক্রান্তদের পৃথকভাবে হিসাব রাখা শুরু হয়। এর মধ্যে চার মাস বয়সী এক শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং চোখ ও মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা যাচ্ছে, যা হামের মারাত্মক দিককে সামনে আনছে।

নিচে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—

সূচকপরিসংখ্যান
মোট ভর্তি (১১ দিনে)১০৫ জন
মোট মৃত্যু৩ জন
বর্তমানে চিকিৎসাধীন৬৯ জন
নির্ধারিত শয্যা৬০টি
বাস্তব রোগীর সংখ্যা৩০০–৪০০ (প্রায়)

রোগীদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক শিশুই নিয়মিত টিকাদান সম্পন্ন করতে পারেনি। কেউ কেউ প্রথম ডোজ নেওয়ার পর পরবর্তী টিকা মিস করেছে, আবার কেউ নানা কারণে সময়মতো টিকা দিতে পারেনি। চিকিৎসকদের মতে, এই টিকাদান ঘাটতিই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে।

শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান জানান, হাম অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায় এবং আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এলেই অন্যরা ঝুঁকিতে পড়ে। তাই আক্রান্তদের আলাদা রাখা অত্যন্ত জরুরি হলেও অতিরিক্ত রোগীর চাপে শতভাগ আইসোলেশন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় নমুনা পরীক্ষা চলছে, তবে হঠাৎ এই বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও নিশ্চিত নয়।

হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা মনে করছেন, করোনা মহামারির সময় টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত এবং পরবর্তী সময়ের নানা সামাজিক অস্থিরতার কারণে নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার ফল এখন দেখা যাচ্ছে।

এদিকে জেলা পর্যায়েও সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৃথক শয্যার ব্যবস্থা এবং ‘ডেডিকেটেড ফিবার ক্লিনিক’ চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ—শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়া, আক্রান্তদের আলাদা রাখা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই এই পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রধান উপায়।