হাদি হত্যা মামলার প্রধান দুই আসামির ১৪ দিনের রিমান্ড

রাজধানীতে আলোচিত শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেপ্তারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ অভিযান দল চৌদ্দ দিনের জন্য নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। স্থানীয় আদালত পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে এই রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন বলে জানা গেছে।

পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রবিবার উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বনগাঁও সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। এর আগে গোপন সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকদিন ধরে ওই এলাকায় নজরদারি চালানো হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত শনিবার গভীর রাতে সীমান্তঘেঁষা এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।

পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুই ব্যক্তি অবৈধভাবে ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে—এমন তথ্য তারা গোপন সূত্রে পায়। আরও জানা যায়, তারা আত্মগোপনে থেকে সুযোগ বুঝে পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে বনগাঁও সীমান্ত এলাকায় তল্লাশি জোরদার করা হয় এবং অবশেষে অভিযানে তাদের আটক করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে, ফয়সাল করিম মাসুদ, যিনি রাহুল নামেও পরিচিত, এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। তারা প্রথমে মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে। এরপর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কিছুদিন অবস্থান করে আত্মগোপনে থাকার চেষ্টা করে। পরে পরিস্থিতি অনুকূল মনে করে তারা বাংলাদেশে ফিরে আসার পরিকল্পনা করে এবং সেই উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁও সীমান্ত এলাকায় আসে। সীমান্ত অতিক্রমের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তারা ধরা পড়ে।

ভারতের একটি সংবাদ সংস্থাও তাদের গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ অভিযান দল সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। গত ৬ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। অভিযোগপত্রে মোট সতেরো জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তদন্তে প্রাথমিকভাবে ধারণা পাওয়া গেছে যে হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে সংঘটিত হয়েছে। তিনি জানান, প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ একটি ছাত্রসংগঠনের সদস্য ছিলেন। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিরোধের জের ধরেই শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলা চালানো হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

তিনি আরও জানান, মামলায় অভিযুক্ত সতেরো জনের মধ্যে ইতোমধ্যে বারো জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুর প্রায় দুইটার দিকে রাজধানীর বক্স কালভার্ট এলাকায় রিকশাযোগে যাওয়ার সময় শরিফ ওসমান হাদির ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে করে আসা দুই হামলাকারী খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর তাকে বিমানযোগে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

নিচে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

বিষয়তথ্য
ভুক্তভোগীর নামশরিফ ওসমান হাদি
হামলার তারিখ১২ ডিসেম্বর
হামলার স্থানরাজধানীর বক্স কালভার্ট এলাকা
প্রধান আসামিফয়সাল করিম মাসুদ
সহযোগীআলমগীর হোসেনসহ মোট ১৭ জন অভিযুক্ত
গ্রেপ্তারের স্থানবনগাঁও সীমান্ত এলাকা, পশ্চিমবঙ্গ
বর্তমান অবস্থাচৌদ্দ দিনের জিজ্ঞাসাবাদে

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামির বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, পেছনের উদ্দেশ্য এবং অন্যান্য জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।