হাজী সেলিম । বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ

হাজী মোহাম্মদ সেলিম (জন্ম: ৫ অক্টোবর ১৯৫৮) বাংলাদেশের রাজনীতির এক বহুল আলোচিত ও প্রভাবশালী নাম। তিনি একাধারে ব্যবসায়ী, সমাজসেবক, এবং রাজনীতিবিদ। পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার মাধ্যমে এক বিশিষ্ট অবস্থান তৈরি করেছেন। তিনবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত এই নেতা বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, যদিও তার রাজনৈতিক পথচলা ছিল নানা উত্থান-পতনের গল্পে পরিপূর্ণ।

 

প্রারম্ভিক জীবন পরিবার

হাজী মোহাম্মদ সেলিম ১৯৫৮ সালের ৫ অক্টোবর, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা চাঁন মিয়া সরদার এবং মাতা সালেহা বেগম
শিক্ষাজীবনে তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেই কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসায়িক জীবনেও সক্রিয় ছিলেন তিনি, যা তাকে আর্থিকভাবে স্বনির্ভরতা এবং প্রভাব এনে দেয়।

 

রাজনৈতিক উত্থান সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব

হাজী সেলিমের রাজনীতিতে উত্থান শুরু হয় ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে, যেখানে তিনি ঢাকা-আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তবে তার রাজনৈতিক জীবন ছিল বহুধাবিভক্ত ও কৌশলনির্ভর—

  • ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে, তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন কিন্তু বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর কাছে পরাজিত হন।
  • ২০১৪ সালে, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন এবং দলের প্রার্থী মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে পরাজিত করে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন
    ওই সময় তিনি ১৬ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নিয়ে একটি সংসদীয় জোট গঠন করেন, যা ছিল ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক কৌশলের দৃষ্টান্ত।
  • ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, তিনি পুনরায় আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন, যা তার রাজনৈতিক পুনর্বাসনের নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

ব্যবসা, সামাজিক অবস্থান জনপ্রিয়তা

রাজনীতির বাইরে হাজী সেলিম ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী।
পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তার মালিকানাধীন ব্যবসা ও সম্পত্তি রয়েছে, যার মধ্যে আবাসন, বাণিজ্যিক প্রকল্প এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ অন্যতম।
তিনি পুরান ঢাকায় বেশ জনপ্রিয়ও ছিলেন, বিশেষ করে দানশীলতা, ধর্মীয় অনুদান ও এলাকার উন্নয়নমূলক কাজের জন্য।
তবে একই সঙ্গে, তার বিরুদ্ধে সম্পদ অর্জনে অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার অভিযোগ সময় সময় সামনে এসেছে।

 

দুর্নীতি মামলা সাংসদ পদ হারানোর দিকচিহ্ন

একাধিকবার আলোচিত হওয়া এই নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি মামলায় অভিযোগ গঠন করে, যার প্রেক্ষিতে আদালত তাকে সাজা প্রদান করেন
দুদক আইনজীবী খুরশীদ আলম খান গণমাধ্যমকে জানান, সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকতে পারেন না। ফলে আদালতের রায় অনুযায়ী হাজী সেলিমের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যায়

এটি শুধু তার ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক জীবনের জন্যই নয়—বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে ওঠে:
আইনের শাসন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অবস্থান কেমন হওয়া উচিত, তার বাস্তব প্রমাণ।

 

রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিতর্কের ছায়া

সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার ফলে হাজী সেলিমের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে তাঁর জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি এবং স্থানীয় প্রভাব তাকে এখনও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রস্থলে রেখেছে।
বিভিন্ন সময় তার পুত্র ইরফান সেলিম-এর বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে, যা এই পরিবারকে আরও বেশি সংবাদমাধ্যমের নজরে এনে দেয়।
দলীয় পর্যায়ে এখনও তার সদস্যপদ স্থগিত না হলেও, নৈতিক অবস্থানের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা স্পষ্ট নন।

 

google news
গুগোল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

হাজী মোহাম্মদ সেলিমের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়—উত্থান, জনপ্রিয়তা, সংঘাত, সফলতা ও পতন—বাংলাদেশের নগরভিত্তিক রাজনীতির বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তিনি ছিলেন এমন একজন রাজনীতিক, যিনি জনগণের চাহিদা ও নিজের স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রেখে নির্বাচনে জয়ী হতে জানতেন, কিন্তু আইন ও নৈতিকতার মানদণ্ডে অনেক সময়েই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন।

Leave a Comment