চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের চরমথুরা গ্রামে হাঁস চুরির অভিযোগে স্থানীয় গ্রাম্য সালিশে ‘নাকে খত’ দেওয়ানোর অপমান সইতে না পেরে মো. মাসুম (২০) নামের এক যুবক আত্মহত্যা করেছেন। নিহত মাসুম স্থানীয় মিজি বাড়ির আলাউদ্দিন মিয়ার ছেলে। রবিবার (৮ মার্চ) সন্ধ্যায় এই দুঃখজনক ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একই গ্রামের পাটওয়ারী বাড়ির মো. নয়ন পাটওয়ারীর দুটি চীনা হাঁস ও একটি দেশি হাঁস গত শুক্রবার রাতে চুরি হয়। পরদিন সকালে হাঁস না পেয়ে পরিবারের লোকজন জানতে পারেন, মাসুম এগুলো রাবেয়া বেগম নামে এক গৃহবধূর কাছে বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পর রবিবার দুপুরে মাসুমের বাড়িতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের উপস্থিতিতে গ্রাম্য সালিশ বসে। সালিশে সাক্ষ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে মাসুমকে অভিযুক্ত করা হয়। তাকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার শর্তে ‘নাকে খত’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরিবারের দাবি, এ ঘটনায় মাসুম অপমানিত ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। সন্ধ্যায় পরিবারের অগোচরে ঘরের আঁড়ার সঙ্গে গলায় রশি পেঁচিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। পরে স্থানীয়রা বিষয়টি টের পেয়ে পুলিশকে জানালে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, মাসুমের বিরুদ্ধে এর আগেও চুরির অভিযোগ ছিল। হাঁস চুরির অপরাধ স্বীকার করার পর তাকে জরিমানা ও নাকে খত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তিনি শুনেছেন, মাসুম এই অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন।
মাসুমের বাবা আলাউদ্দিন মিয়া অভিযোগ করেছেন, নয়ন পাটওয়ারীসহ কয়েকজন তার ছেলেকে মারধর করেছেন এবং ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে একতরফা সালিশের মাধ্যমে তাকে ফাঁসানো হয়েছে। তিনি ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচার দাবি করেছেন।
অপরদিকে হাঁসের মালিক নয়ন পাটওয়ারী জানান, হাঁস চুরির ঘটনা জানানো হয়েছিল এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সালিশে বিচার করেছেন; তিনি রায়ে সন্তুষ্ট। মারধরের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
ফরিদগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক মো. হেলালউদ্দিন জানান, মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের ফলাফলের পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিচে ঘটনার সংক্ষিপ্ত তথ্য টেবিলে উপস্থাপন করা হলো—
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| নিহতের নাম | মো. মাসুম (২০) |
| পিতার নাম | আলাউদ্দিন মিয়া |
| বসবাসস্থল | মিজি বাড়ি, চরমথুরা, গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়ন |
| অভিযোগ | হাঁস চুরি |
| হামলার শিকার হাঁস | দুই চীনা হাঁস ও একটি দেশি হাঁস |
| সালিশের সিদ্ধান্ত | পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, নাকে খত |
| আত্মহত্যার সময় | রবিবার (৮ মার্চ) সন্ধ্যা |
| আহত/প্রতিক্রিয়া | মানসিক চাপ ও অপমানের কারণে আত্মহত্যা |
| স্থানীয় বক্তব্য | ইউপি সদস্য: পূর্ববর্তী অভিযোগসহ অপরাধ স্বীকার; নয়ন পাটওয়ারী: রায়ে সন্তুষ্ট |
| পুলিশ পদক্ষেপ | মরদেহ উদ্ধার, সুরতহাল প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত জেলা সদর হাসপাতালে |
এই ঘটনা স্থানীয় গ্রাম্য সালিশ ব্যবস্থার অপব্যবহার, যুবকের মানসিক চাপ এবং সামাজিক অপমানের মারাত্মক প্রভাব তুলে ধরে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রামীণ সালিশে এমন শাস্তিমূলক প্রথা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে তা ব্যক্তি জীবন ও সামাজিক শান্তির জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
