বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার বর্তমানে এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার মূল কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা। তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, হামলা এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানির দামে দ্রুত ওঠানামা দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি একাধিক ঘটনার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রথমে দ্রুত কমে যায়, পরে আবার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যুদ্ধ পরিস্থিতির শুরুর দিকে দাম সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছালেও পরবর্তীতে কিছুটা সংশোধন হয়। তবে সামগ্রিকভাবে বাজার এখনো উচ্চমূল্যের চাপেই রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বাভাবিকতা না ফিরলে এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের একটি বড় অংশ চলাচল করে। এই পথ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের সমান।
বাজারের মূল পরিবর্তন (সারণি)
| জ্বালানির ধরন | যুদ্ধের আগে গড় দাম (ডলার/ব্যারেল) | বর্তমান আনুমানিক দাম (ডলার/ব্যারেল) |
|---|---|---|
| অপরিশোধিত তেল | প্রায় ৯০ | প্রায় ১০৫ |
| পেট্রল | প্রায় ৮০ | প্রায় ১২০ |
| ডিজেল | প্রায় ৯৩ | প্রায় ১৭৫ |
| জেট ফুয়েল | প্রায় ৯৪ | ২০০-এর বেশি |
বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরিশোধিত জ্বালানির দাম অপরিশোধিত তেলের তুলনায় অনেক বেশি হারে বেড়েছে, যা পরিবহন ও শিল্প খাতে সরাসরি চাপ তৈরি করছে।
এশিয়া বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় অংশের রপ্তানি এই অঞ্চলে যাওয়ায় সেখানে মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে। কিছু দেশে কৌশলগত মজুত ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং কয়েকটি দেশে জ্বালানি রেশনিংও চালু করা হয়েছে। শোধনাগারগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হওয়ায় সরবরাহ ঘাটতি আরও তীব্র হচ্ছে।
অন্যদিকে ইউরোপ এখনো ভর্তুকি ও কর ছাড়ের মাধ্যমে ভোক্তা পর্যায়ে চাপ কমানোর চেষ্টা করছে। ফলে সেখানে জ্বালানির চাহিদা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও শোধনাগারগুলো উচ্চমূল্যে কাঁচামাল কিনে ক্ষতির মুখে পড়ছে। ভবিষ্যৎ সরবরাহের চেয়ে বর্তমান দামের বেশি হওয়ায় তাদের মুনাফা কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন কমানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারে তিনটি প্রধান কারণ সংকটকে ঘনীভূত করছে: প্রথমত, সমুদ্রে ভাসমান তেলের মজুত দ্রুত কমে যাওয়া; দ্বিতীয়ত, শোধনাগার উৎপাদন হ্রাস; তৃতীয়ত, অঞ্চলভিত্তিক চাহিদার অসমতা। এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে বাজারের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এতে শুধু দাম নয়, পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ভোক্তা পর্যায়ের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। ফলে অনেক উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িক অস্থিরতা নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা স্বল্পমেয়াদে সহজে সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম।