হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে ন্যাটোর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে স্পষ্ট

কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য সামরিক অবরোধ বা হস্তক্ষেপের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করেছে উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা (ন্যাটো)। সোমবার (১৩ এপ্রিল) ন্যাটোভুক্ত একাধিক সদস্য রাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানায়, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তারা কোনো ধরনের সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ন্যাটোর এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রত্যাশার সঙ্গে সরাসরি বিরোধ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বে দাবি করেছিলেন যে, হরমুজ প্রণালির মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে পশ্চিমা মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকবে। তবে সাম্প্রতিক ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর ঘোষণা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং কূটনৈতিক দূরত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র সামরিক কৌশল নয়, বরং পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরীণ নীতিগত পার্থক্যেরও প্রতিফলন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনায় ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়াতে অনিচ্ছুক বলেই মনে করা হচ্ছে।

ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত যুক্তরাজ্য, জার্মানি, স্পেন, ইতালি, পোল্যান্ড এবং গ্রিস—এই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশগুলো একযোগে জানিয়েছে যে তারা হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের সামরিক শক্তি প্রয়োগ বা অবরোধ কার্যক্রমে অংশ নেবে না। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার এ বিষয়ে বলেন, দেশের অবস্থান পরিষ্কার—এই সংঘাতে সরাসরি জড়ানো হবে না এবং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করার কোনো ইচ্ছা নেই।

অন্যদিকে ফ্রান্স তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী অবস্থান নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে একটি আন্তর্জাতিক সমন্বিত মিশন গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই ধরনের উদ্যোগ কেবল তখনই কার্যকর হবে যখন সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত হবে এবং উত্তেজনা হ্রাস পাবে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হিসেবে পরিচিত। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা বা সামরিক উত্তেজনা দেখা দিলে তা সরাসরি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়লে তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দার চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

নিচে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর অবস্থানের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো—

দেশঅবস্থান
যুক্তরাজ্যসামরিক হস্তক্ষেপে অংশ নেবে না
জার্মানিঅবরোধে সমর্থন নয়
স্পেননিরপেক্ষ অবস্থান বজায়
ইতালিসামরিক পদক্ষেপে বিরোধিতা
পোল্যান্ডসংঘাতে জড়াবে না
গ্রিসসামরিক হস্তক্ষেপ নাকচ
ফ্রান্সআন্তর্জাতিক মিশনের বিষয়ে আলোচনা চলমান

ন্যাটোর এই সম্মিলিত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক কৌশলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, পশ্চিমা জোটের মধ্যে এ ধরনের মতপার্থক্য দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোতে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে।

সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি ঘিরে ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানগত পার্থক্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ও নিরাপত্তাভিত্তিক অবস্থান, অন্যদিকে ইউরোপীয় মিত্রদের সংযত ও কূটনৈতিক সতর্কতা—এই দ্বৈত অবস্থান বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন অনিশ্চয়তা যোগ করছে।