ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইরান কৌশলগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ এজেন্সি’ জানিয়েছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) ভিএইচএফ বেতার বার্তার মাধ্যমে ওই এলাকায় অবস্থানরত জাহাজগুলোকে চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিচ্ছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তেহরান এখনও চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়নি, তবে রয়টার্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌ মিশনের তথ্যানুযায়ী, এই জলপথে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালি: বৈশ্বিক জ্বালানির প্রধান ধমনী
ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের মাধ্যমে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি কেবল একটি সামুদ্রিক পথ নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণভোমরা। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানির একমাত্র পথ এটি। এছাড়া বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতারের গ্যাস সরবরাহের একমাত্র মাধ্যমও এই প্রণালি।
নিচে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব ও এটি বন্ধ হওয়ার সম্ভাব্য প্রভাবের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | পরিসংখ্যান ও গুরুত্ব | বন্ধ হওয়ার সম্ভাব্য প্রভাব |
| দৈনিক তেল পরিবহন | ২ কোটি ব্যারেল (বিশ্বের ২০%) | বাজারে তেলের তীব্র সংকট ও রেশনিং ব্যবস্থা। |
| এলএনজি সরবরাহ | বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় ২০-২৫% | এশিয়া ও ইউরোপে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া। |
| জ্বালানির মূল্য (বর্তমান) | ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেলপ্রতি ৭৩-৮০ ডলার | একলাফে ১০০ ডলার ছাড়ানোর প্রবল শঙ্কা। |
| বৈশ্বিক পরিবহন | প্রতিদিন শত শত বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজ | সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়া ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধি। |
বিশ্ব অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয়ের শঙ্কা
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (EIA) হিসাব মতে, প্রতিদিন বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই ‘চোকপয়েন্ট’ বন্ধ হওয়া মানে হলো বিশ্ব অর্থনীতির ইঞ্জিন স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস এবং ভারতের ইকুইরাস সিকিউরিটিজ সতর্ক করেছে যে, অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
মুদ্রাস্ফীতি ও শিল্পোৎপাদনে আঘাত
তেলের দাম বাড়লে কেবল পরিবহন খরচ বাড়ে না, বরং কৃষি থেকে শুরু করে ভারী শিল্প—সব খাতেই উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) পাহাড় তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, যারা আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং কলকারখানা বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, যা সামাজিক অস্থিরতাকেও উসকে দিতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা কেবল একটি আঞ্চলিক সামরিক সংকট নয়, এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক হুমকি। যদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে দ্রুত এই জলপথ উন্মুক্ত করা না যায়, তবে বিশ্ববাসী এক দীর্ঘমেয়াদী মন্দার কবলে পড়বে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA) পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, তবে এই বিশাল সরবরাহ ঘাটতি মেটানোর মতো কোনো বিকল্প ব্যবস্থা বর্তমানে বিশ্বের হাতে নেই।
