লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করা হবিগঞ্জের ৩৮ তরুণের পরিণতি আজও অন্ধকারে। যাত্রার দুই মাস আট দিন পেরিয়ে গেলেও তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজ যুবকদের পরিবারে এখন শোক, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার ছায়া—প্রতিটি দিন কাটছে দুঃস্বপ্নের মতো। মানব পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত স্থানীয় ‘আদম দালাল’ হাসান মোল্লাসহ আটজনকে নোটিশ দিয়েছে জেলা পুলিশ, তবে অভিযুক্তরা গা-ঢাকা দিয়ে থাকায় তদন্ত আরও জটিল হয়ে উঠছে।
হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোছা. ইয়াছমিন খাতুন জানান, নিখোঁজ যুবকদের পরিবার এখনো আইনি পদক্ষেপ নিতে সাহস পাচ্ছে না। তিনি বলেন, “পরিবারগুলোকে মামলা করার জন্য আমরা আহ্বান জানিয়েছি। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে আইনি পদক্ষেপ জরুরি।” এ ছাড়া হাসান মোল্লার চার সহযোগী—মোস্তাকিম, তফছির, মিজান ও সোহাগকে তলব করেছে পুলিশ, যাদের আজমিরীগঞ্জ থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তদন্তকারীদের সামনে হাজির করাতে।
Table of Contents
লিবিয়া দূতাবাসের চেষ্টা ব্যর্থ
লিবিয়ার কারাগার, হাসপাতাল, কোস্টগার্ডসহ সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ চালিয়েও কোনো তথ্য পায়নি লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাসের প্রথম সচিব মো. রাসেল মিয়া জানান, “যুবকদের কেউ বিভিন্ন দেশ হয়ে লিবিয়ায় প্রবেশ করেছেন। তাদের সঠিক তথ্য আমরা কখনোই পাইনি।”
তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা রেডক্রিসেন্টসহ অন্যান্য সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে, কিন্তু তারাও কোনো তথ্য দিতে পারেনি। এ অবস্থায় ধারণা করা হচ্ছে, নৌকাটি মাঝ সমুদ্রে ডুবে যেতে পারে।
নিখোঁজ হওয়ার নাটকীয় প্রেক্ষাপট
গত ৩০ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার ত্রিপলি উপকূল থেকে চারটি নৌকা ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করে। এর মধ্যে তিনটি নিরাপদে ইতালিতে পৌঁছালেও, একটি নৌকায় থাকা হবিগঞ্জের ৩৮ জনসহ প্রায় ৯০ জন যাত্রীর আর কোনো হদিস নেই। যাত্রার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্বজনদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
হাসান মোল্লার ‘মানব পাচার সাম্রাজ্য’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আজমিরীগঞ্জের পশ্চিমভাগ গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী হাসান আশরাফ ওরফে হাসান মোল্লা ইতালি পাঠানোর নামে হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে একজন ক্ষমতাধর দালাল হিসেবে পরিচিত। মাত্র ছয় মাসে প্রায় এক হাজার মানুষকে ইতালি পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক পাচার চক্রে নিজের অবস্থান পোক্ত করেছেন তিনি।
অভিযোগ আছে, ত্রিপলি উপকূল থেকে ১০ ঘণ্টার বিপজ্জনক নৌপথে মানুষ পাচারের বিনিময়ে তিনি অর্জন করেছেন শত কোটি টাকা।
পরিবারের দীর্ঘশ্বাস—প্রিয়জন ফিরবে তো?
নিখোঁজ যুবকদের প্রতিটি পরিবারই হাসানের হাতে ১৭–২০ লাখ টাকা করে দিয়েছিল। এখন তারা আশঙ্কা করছেন—তাদের প্রিয়জনেরা হয়তো আর বেঁচে নেই। ভয়, অপরাধীদের হুমকি এবং সামাজিক চাপের কারণে অনেক পরিবারই প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারছে না।
তথ্য-উপাত্ত (টেবিল আকারে)
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নিখোঁজের সংখ্যা | ৩৮ জন (হবিগঞ্জ) |
| মোট যাত্রী | ~৯০ জন |
| যাত্রার তারিখ | ৩০ সেপ্টেম্বর |
| যাত্রার স্থান | ত্রিপলি, লিবিয়া |
| গন্তব্য | ইতালি |
| দায়িত্বপ্রাপ্ত দালাল | হাসান আশরাফ ওরফে হাসান মোল্লা |
| পরিবারগুলো যে টাকা দিয়েছে | প্রতিজন ১৭–২০ লাখ টাকা |
| তদন্ত সংস্থা | জেলা পুলিশ, লিবিয়া দূতাবাস |
| এখন পর্যন্ত উদ্ধার | কেউ নয় |
| পূর্বের অনুরূপ ঘটনা | মার্চে ১৫ বাংলাদেশি নিখোঁজ (খোঁজ মেলেনি) |