হজ-ওমরাহযাত্রীদের জন্য সাউদিয়ার ফ্রি হাই-স্পিড ওয়াইফাই সেবা

সৌদিয়া এয়ারলাইনসে আকাশপথে বিনামূল্যে উচ্চগতির ওয়াইফাই সেবা

বর্তমান যুগে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘ আকাশপথের ক্লান্তিকর ভ্রমণে ইন্টারনেটের উপস্থিতি যাত্রীদের অভিজ্ঞতায় যোগ করে নতুন এক মাত্রা। এই প্রেক্ষাপটে আকাশপথের যাত্রীসেবাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সৌদি আরবের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা ‘সাউদিয়া এয়ারলাইনস’ একটি বৈপ্লবিক ঘোষণা দিয়েছে। তারা তাদের ফ্লাইটে যাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উচ্চগতির ওয়াইফাই সেবা চালু করেছে। বিশেষ করে পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালনকারী এবং অন্যান্য পর্যটকদের জন্য এই সংবাদটি এক বিশেষ প্রাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রযুক্তির এক নতুন দিগন্ত উম্মোচন

সাউদিয়া এয়ারলাইনসের এই নতুন উদ্যোগের ফলে এখন থেকে যাত্রীরা মাঝ আকাশে অর্থাৎ ৩৫ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থান করেও বিশ্বের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারবেন। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের এই উন্নত প্রযুক্তির ইন্টারনেট সংযোগের গতি হবে ঘণ্টায় ৩০০ মেগাবাইট (Mbps)। সাধারণত আকাশপথে ইন্টারনেটের গতি অত্যন্ত ধীর থাকে এবং তা কেবল টেক্সট মেসেজিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু সাউদিয়ার এই হাই-স্পিড ওয়াইফাই সেবার মাধ্যমে যাত্রীরা এখন উচ্চমানের ভিডিও স্ট্রিমিং, অনলাইন গেমিং এবং পেশাগত মিটিংয়ের মতো কাজগুলো কোনো বিঘ্ন ছাড়াই সম্পন্ন করতে পারবেন।

সফল পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন ও অভিজ্ঞতা

এই যুগান্তকারী সেবার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় রিয়াদ থেকে জেদ্দাগামী বিশেষ ফ্লাইট ‘এসভি-১০৪৪’-এর মাধ্যমে। উদ্বোধনী এই ফ্লাইটে উপস্থিত ছিলেন সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীবর্গ এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা। ৩৫ হাজার ফুট উচ্চতায় বিমানে বসে তাঁরা সরাসরি ফুটবল ম্যাচ স্ট্রিমিং করেন এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী এই পরীক্ষায় ইন্টারনেটের গতি ও স্থিতিশীলতা ছিল সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন, যা বিমান চলাচল ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। উচ্চ গতিসম্পন্ন এই ইন্টারনেট সংযোগ কোনো ধরনের বাফারিং ছাড়াই কাজ করায় উপস্থিত কর্মকর্তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন।

পর্যায়ক্রমিক সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক রুট

বর্তমানে সাউদিয়া এয়ারলাইনসের ২০টি বিমানে এই অত্যাধুনিক ওয়াইফাই সেবা চালু করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি মূলত অভ্যন্তরীণ রুট হিসেবে পরিচিত রিয়াদ-জেদ্দা রুটে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে জানিয়েছে যে, এই সেবাটি খুব শীঘ্রই তাদের সকল আন্তর্জাতিক রুটেও সম্প্রসারণ করা হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হজ ও ওমরাহযাত্রীরা যাতে বিমানে বসে তাঁদের পরিবারের সাথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করতে পারেন, সেটিই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান লক্ষ্য।

নিচে সাউদিয়া এয়ারলাইনসের এই নতুন ইন্টারনেট সেবার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

সেবার বৈশিষ্ট্যবিস্তারিত তথ্য
ইন্টারনেটের ধরনহাই-স্পিড স্যাটেলাইট ওয়াইফাই।
বর্তমান গতি৩০০ মেগাবাইট প্রতি ঘণ্টা (300 Mbps)।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা৮০০ মেগাবাইট পর্যন্ত বৃদ্ধি (800 Mbps)।
সেবার মূল্যসম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
বর্তমান আওতা২০টি বিমান (রিয়াদ-জেদ্দা রুট)।
উদ্বোধনী ফ্লাইটএসভি-১০৪৪ (SV-1044)।
প্রধান সুবিধাভোগীহজ, ওমরাহযাত্রী ও আন্তর্জাতিক পর্যটক।

বিলাসিতা নয়, এখন এটি সময়ের দাবি

বিমান শিল্প বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আকাশপথে বিনামূল্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা এখন আর বিলাসিতার বিষয় নয়, বরং এটি আধুনিক যাত্রীদের মৌলিক চাহিদার অংশে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য নামী বিমান সংস্থাগুলো যেখানে সীমিত গতির ইন্টারনেটের জন্য চড়া মূল্য আদায় করে, সেখানে সাউদিয়ার এই ‘ফ্রি অব কস্ট’ মডেলটি একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য বিমান সংস্থাগুলোর জন্য একটি নতুন বৈশ্বিক মানদণ্ড তৈরি করবে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সাউদিয়াকে কয়েক ধাপ এগিয়ে রাখবে।

ভবিষ্যতে আরও গতি ও উৎকর্ষের প্রতিশ্রুতি

সাউদিয়া এয়ারলাইনস কেবল ৩০০ মেগাবাইটে থমকে থাকতে চায় না। তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও সুদূরপ্রসারী। সংস্থাটি জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে এই ইন্টারনেটের গতি বাড়িয়ে ৮০০ মেগাবাইট পর্যন্ত উন্নীত করা হবে। এর ফলে যাত্রীরা আকাশপথে বসে গ্রাউন্ড লেভেলের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের মতোই অভিজ্ঞতা পাবেন। একজন পেশাদার করপোরেট ব্যক্তিত্ব যেমন মাঝ আকাশে বসে ল্যাপটপে তাঁর অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সারতে পারবেন, তেমনি একজন সাধারণ ভ্রমণকারীও প্রিয়জনের সাথে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও শেয়ার করতে পারবেন।

সাউদিয়া এয়ারলাইনসের কর্মকর্তাদের মতে, এই সেবাটি ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’-এর একটি অংশ, যেখানে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মাধ্যমে পর্যটন ও সেবা খাতকে বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে সৌদি আরব অভিমুখে যাতায়াতকারী আন্তর্জাতিক যাত্রীদের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, আকাশপথের এই ডিজিটাল রূপান্তর বৈশ্বিক বিমান যাতায়াতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। সাউদিয়া এয়ারলাইনসের এই নিরবচ্ছিন্ন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ এবং একা ভ্রমণকারী ওমরাহযাত্রীদের জন্য এক আশীর্বাদস্বরূপ হবে, কারণ তাঁরা এখন এক ক্লিকেই সুদূর প্রবাস থেকে নিজের ঘরের মানুষের সাথে কথা বলতে পারবেন। আধুনিক ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় এই সংযোজন নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।