স্মৃতির পাতায় ইন্দ্রমোহন রাজবংশী

ইন্দ্রমোহন রাজবংশী—একটি কণ্ঠ, একটি সংগ্রাম, একটি সময়। তিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সঙ্গীতশিল্পী, লোকগান সংগ্রাহক এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক। তাঁর কণ্ঠ কেবল সুরের বাহক ছিল না; ছিল সাহস, প্রত্যয় ও মুক্তির ডাক।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর গাওয়া গান রণাঙ্গনের মুক্তিকামী যোদ্ধাদের মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখত। অস্ত্রের পাশাপাশি কণ্ঠকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন ইন্দ্রমোহন। তিনি প্রমাণ করেছেন, গানও যুদ্ধের এক শক্তিশালী অস্ত্র হতে পারে।

তথ্যবিবরণ
জন্ম২৬ জানুয়ারি ১৯৪৬
জন্মস্থানঢাকা, বাংলাদেশ
মৃত্যু৭ এপ্রিল ২০২১
পেশাসঙ্গীতশিল্পী, মুক্তিযোদ্ধা, শব্দসৈনিক, লোকগান সংগ্রাহক
স্বীকৃতিএকুশে পদক ২০১৮
পরিবারস্ত্রী: দীপ্তি রাজবংশী, পুত্র: রবীন রাজবংশী
বিশেষ অবদানস্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান, লোকসংগীত সংগ্রহ, বাংলাদেশ লোকসংস্কৃতি পরিষদ প্রতিষ্ঠা

ইন্দ্রমোহন রাজবংশী ১৯৫৭ সালে বেতারের ‘ছোটদের আসর’ অনুষ্ঠানে গান করার মাধ্যমে তাঁর সংগীত যাত্রা শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে চলচ্চিত্র চেনা অচেনা-তে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে অভিষেক ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বন্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর দোভাষী হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে বিপজ্জনক অবস্থান থেকে সরাসরি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যুক্ত হয়ে মুক্তিকামী যোদ্ধাদের জন্য গান করেন।

ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, জারি, সারি, মুর্শিদি—লোকসংগীতের প্রায় সব ধারায় তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতেও তিনি নিজের স্বতন্ত্র মর্যাদা তৈরি করেছিলেন। চলচ্চিত্র, বেতার ও টেলিভিশনে অসংখ্য গান গেয়ে তিনি বাংলা সঙ্গীতজগতে চিরস্থায়ী ছাপ রেখেছেন।

সঙ্গীতচর্চার পাশাপাশি তিনি আজীবন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে লোকগান সংগ্রহ করেন। সহস্রাধিক কবির লেখা কয়েক লাখ গান সংরক্ষণ করেছেন, যা বাংলা লোকসংস্কৃতির এক অনন্য ভাণ্ডার।

ইন্দ্রমোহন রাজবংশীকে ২০১৮ সালে অসামান্য সাংস্কৃতিক অবদানের জন্য একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ব্যক্তিজীবনে তাঁর পরিবারও সঙ্গীতচর্চায় নিয়োজিত—যেন সুরের উত্তরাধিকার এখনও বহমান।

৭ এপ্রিল ২০২১ সালে তিনি আমাদের ছেড়ে গেলেও, তাঁর গান, সংগ্রহ এবং সংগ্রাম আজও বেঁচে আছে বাংলার মানুষের কণ্ঠে ও স্মৃতিতে। তাঁর অবদান স্মরণীয় এবং চিরস্থায়ী।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।