চিরন্তন সৌন্দর্যের পূজারি
“সৌন্দর্যই সত্য, সত্যই সৌন্দর্য”— এই অমর পঙক্তিটি শুধু একটি কবিতার চরণ নয়; এটি মানবজীবনের নন্দনদর্শনের এক শাশ্বত ঘোষণা। এই অনবদ্য বাণীর রচয়িতা, রোমান্টিক যুগের উজ্জ্বল নক্ষত্র জন কিটস, স্বল্পায়ু জীবনেও বিশ্বসাহিত্যে রেখে গেছেন অতুলনীয় দীপ্তি।
Table of Contents
জন্ম ও শৈশব
জন কিটস ১৭৯৫ সালের ৩১ অক্টোবর লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা টমাস কিটস প্রথমে আস্তাবলে কর্মচারী ছিলেন, পরে সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের কন্যাকে বিয়ে করে মালিকানা লাভ করেন। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে জন কিটস ছিলেন অন্যতম।
শৈশবের শিক্ষা শুরু হয় এনফিল্ডের জন ক্লার্কের স্কুলে। ছোট হলেও স্কুলটি আধুনিক ও সৃজনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা অনুসরণ করত। সেখানেই চার্লস কাউডেন ক্লার্কের সংস্পর্শে এসে কিটসের কবি-প্রতিভার প্রথম উন্মেষ ঘটে। সাহিত্যিক ও সংগীতময় পরিবেশ তাঁর কল্পনাশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
দুঃখের ছায়া ও সংগ্রাম
মাত্র আট বছর বয়সে (১৮০৪) পিতার মৃত্যু এবং ১৮১০ সালে মায়ের ক্ষয়রোগে মৃত্যু— শৈশবেই তাঁকে অনাথ করে দেয়। পিতামহীর তত্ত্বাবধানে বড় হতে হতে তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় শিক্ষানবিশ হন। পরে লন্ডনের সেন্ট টমাস হাসপাতালে ভর্তি হলেও মন পড়ত কবিতার জগতে। অবশেষে তিনি চিকিৎসা পেশা ত্যাগ করে সাহিত্যচর্চায় সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেন।
সাহিত্যজীবনের উন্মেষ
| সাল | রচনা/প্রকাশ | উল্লেখযোগ্য বিষয় |
|---|---|---|
| ১৮১৪ | “স্পেন্সারের অনুকরণ” | কাব্যচর্চার সূচনা |
| ১৮১৭ | “কবিতা” | প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ |
| ১৮১৮ | “এন্ডিমিয়ন” | দীর্ঘ কাব্য; প্রথম লাইন বিখ্যাত: “সৌন্দর্যের জিনিস চিরকালের জন্য আনন্দের” |
| ১৮১৯ | বিভিন্ন ওড | “একটি নাইটিঙ্গেলের প্রতি ওড”, “গ্রীক কলসের উপর ওড”, “শরতে” |
১৮১৯ সাল ছিল তাঁর সৃষ্টিশীলতার শ্রেষ্ঠ সময়। প্রকৃতি, প্রেম, বেদনা ও সৌন্দর্যের মূর্ত রূপ এই কবিতাগুলোতে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
প্রেম ও ব্যক্তিগত বেদনা
কিটস প্রেমে পড়েছিলেন ফ্যানি ব্রাউন নামের এক তরুণীর প্রতি। কিন্তু আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং শারীরিক দুর্বলতার কারণে তাঁদের সম্পর্ক পূর্ণতা পায়নি। ব্যক্তিগত বেদনা, ভাই টমের মৃত্যু, আর নিজের দেহে ধরা পড়া ক্ষয়রোগ— সব মিলিয়ে জীবন তাঁর জন্য হয়ে ওঠে এক কঠিন সংগ্রাম।
শেষ যাত্রা
১৮২০ সালে তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ “লামিয়া, ইসাবেলা, সেন্ট অ্যাগনেসের প্রাক্কালে এবং অন্যান্য কবিতা” প্রকাশিত হয়। সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে। চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি ইতালি যান। ১৮২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, রোমে, মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর সমাধিফলকে লেখা হয়েছিল—
“এখানে একজন শুয়ে আছেন যার নাম জলে লেখা ছিল।”
কিন্তু সত্যিই কি তাঁর নাম জলে লেখা ছিল? না— সময় প্রমাণ করেছে, তাঁর নাম খোদাই হয়ে আছে বিশ্বসাহিত্যের অমর পাথরে।
অমরত্বের কারণ
স্বল্পায়ু জীবনে কিটস যে গভীর সৌন্দর্যবোধ, মানবিক বেদনা ও নন্দনচেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তা তাঁকে রোমান্টিক কবিদের শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও পার্সি বাইশে শেলি-এর সমসাময়িক হলেও কিটস নিজস্ব কাব্যভঙ্গিতে অনন্য।
জন কিটস আমাদের শেখান—
সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক নয়, তা অনুভবের গভীরে।
সত্য কেবল যুক্তিতে নয়, তা হৃদয়ের আলোয়।
স্বল্প জীবন, কিন্তু অসীম সৃষ্টি।
এই কারণে জন কিটস চিরকালীন সৌন্দর্যের পূজারি।
