স্মরণে চিরঅমর সুমিতা দেবী

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে যে ক’জন নারী শিল্পী পথিকৃতের ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মধ্যে সুমিতা দেবী ছিলেন সর্বাগ্রে স্মরণীয়। তিনি একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রথিতযশা অভিনয়শিল্পী এবং সফল চলচ্চিত্র প্রযোজক। তাঁর জীবন ও কর্ম এ দেশের সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

সুমিতা দেবীর জন্ম ১৯৩৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জ জেলার দক্ষিণ খল্লি গ্রামে সম্ভ্রান্ত পরিবারে। পারিবারিক নাম হেনা ভট্টাচার্য। চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর কিংবদন্তি পরিচালক ফতেহ লোহানী তাঁর নাম পরিবর্তন করে সুমিতা রাখেন—যা পরবর্তীতে বাংলা চলচ্চিত্রে এক অনন্য মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে।

১৯৬২ সালে তিনি ক্ষণজন্মা চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং নিলুফার বেগম নামে পরিচিত হন। তবে শিল্পী ও জনসাধারণের কাছে তিনি আজীবন সুমিতা দেবী নামেই স্মরণীয় ছিলেন।

সুমিতার অভিনয়জীবন শুরু হয় ১৯৫৭ সালে ফতেহ লোহানী পরিচালিত ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এটি ১৯৬১ সালে শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি লাভ করে এবং সুমিতার প্রথম বড় সফলতা হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি অভিনয় করেন ‘আকাশ আর মাটি’ (১৯৬০) চলচ্চিত্রে এবং ধীরে ধীরে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। প্রায় চার দশকব্যাপী তাঁর অভিনয় জীবনের বিস্তৃতি বহুমাত্রিক ও সমৃদ্ধ।

সুমিতা দেবীর চলচ্চিত্র, নাটক ও প্রযোজনার সংক্ষিপ্ত তথ্য:

বিভাগসংখ্যা/চরিত্রউল্লেখযোগ্য কাজ
নায়িকা চরিত্রে চলচ্চিত্র১০+কখনো আসেনি, সোনার কাজল, কাঁচের দেয়াল, এই তো জীবন, দুই দিগন্ত
পার্শ্বচরিত্রে চলচ্চিত্র১০০+আগুন নিয়ে খেলা, অভিশাপ, এ দেশ তোমার আমার, বেহুলা, স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা
প্রযোজিত চলচ্চিত্রআগুন নিয়ে খেলা, মোমের আলো, মায়ার সংসার, আদর্শ ছাপাখানা, নতুন প্রভাত
পুরস্কার ও সম্মাননা৭+অল পাকিস্তান ক্রিটিক অ্যাওয়ার্ড (1962), নিগার পুরস্কার (1963), বাচসাস পুরস্কার, ট্রাব পুরস্কার, আগরতলা মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কার (2002)

তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তানে নির্মিত *‘ধূপছাঁও’*সহ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন উর্দু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। বেতার, টেলিভিশন ও মঞ্চনাটকেও সুমিতা দেবী সমানভাবে সফল ও সমাদৃত ছিলেন।

অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবে তাঁর অবদানও স্মরণীয়। ব্যক্তিজীবনে প্রথম স্বামী ছিলেন ফরিদপুরের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা অতুল লাহিড়ী।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সুমিতা দেবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। তাঁর কণ্ঠ ও উপস্থিতি মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সাহস ও প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছিল।

সুমিতা দেবীর দুই সন্তান—বড় ছেলে বিপুল রায়হান, একজন বিশিষ্ট লেখক ও নাট্যনির্মাতা, এবং ছোট ছেলে অনল রায়হান, একজন সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী।

২০০৪ সালের ৬ জানুয়ারি তিনি চিরবিদায় নেন এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মীরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত হন। তাঁর অবদান বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমর।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।