স্মরণে এ বি এম মূসা

সত্যের সন্ধানে নির্ভীক এক সাংবাদিক
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—এ বি এম মূসা। তিনি ছিলেন সত্যের নির্ভীক অনুসন্ধানী, আপসহীন এক কণ্ঠস্বর, যিনি কলমকে করেছিলেন মানুষের অধিকারের হাতিয়ার।
১৯৩১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার ধর্মপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ১৯৫০ সালে দৈনিক ইনসাফ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা জীবনে প্রবেশ করেন। একই বছরে যোগ দেন ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভারে—যেখান থেকে শুরু হয় তাঁর বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামী পথচলা।
দীর্ঘ ছয় দশকের কর্মময় জীবনে তিনি ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, সম্পাদক ও কলামিস্ট। বাংলাদেশ অবজারভারের বার্তা সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি পেশাগত দক্ষতা ও নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে তাঁর উপস্থিতি ছিল দৃঢ় ও সক্রিয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিবিসি ও সানডে টাইমসসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রণাঙ্গনের সংবাদ প্রেরণ করে তিনি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন বাংলাদেশের সংগ্রামের বাস্তব চিত্র।
স্বাধীনতার পর জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তবে রাজনীতি কখনোই তাঁর মূল আকর্ষণ ছিল না—সত্য বলা এবং মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর আজীবনের ব্রত।
তিনি ছিলেন জাতীয় প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং চারবার সভাপতি ও তিনবার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে সাংবাদিক সমাজ পেয়েছিল দিকনির্দেশনা ও সাহস।
এ বি এম মূসার লেখনী ছিল ক্ষুরধার, যুক্তিনিষ্ঠ ও নির্ভীক। সরকারের অন্যায় ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার—কোনো ভয়-ভীতি তাঁকে দমাতে পারেনি। জীবনের শেষ প্রান্তেও টেলিভিশন টকশোতে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানুষের কথা বলেই তিনি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেন।
তাঁর রচিত গ্রন্থ “মুজিব ভাই” কেবল একটি বই নয়, বরং ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল—যেখানে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের স্মৃতিচারণ।
২০১৪ সালের ৯ এপ্রিল, রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সাহসী উচ্চারণ এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকার আজও প্রেরণা জোগায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
সত্যের পথে আপসহীন এই যোদ্ধাকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তাঁর দেখানো পথেই এগিয়ে যাক আগামী দিনের সাংবাদিকতা।