স্মরণে অধ্যাপক সুলতানা জামান: জ্ঞান ও মানবতার প্রতীক

অধ্যাপক সুলতানা জামান—পূর্ণ নাম সুলতানা সারওয়াত আরা জামান—জ্ঞান, মানবতা ও সেবার এক অমর প্রতীক। তিনি কেবল একজন প্রজ্ঞাবান শিক্ষাবিদ ছিলেন না, বরং সমাজের প্রতি তার নিবেদিত দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে মানবিকতায় অনন্য করে তুলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে তাঁর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার কাজী নুরুজ্জামান-এর সহধর্মিণী। তাঁর পরিবারও সংস্কৃতি ও জ্ঞানের ধারক; কন্যা লুবনা মারিয়াম ও নায়লা খান দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সুপরিচিত, আর দৌহিত্রী আনুশেহ আনাদিল সংগীতাঙ্গনে উজ্জ্বল নাম।

১৯৩২ সালের ৯ জুন ঝিনাইদহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলাম ও মাতা রাহাত আরা বেগমের কন্যা ছিলেন আট ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ। তার পরিবারে জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য স্পষ্ট—ভাই জামাল নজরুল ইসলাম ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী।

শৈশবের শিক্ষা শুরু করেছিলেন কলকাতার বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত মেমোরিয়াল হাই স্কুলে। দেশভাগের পর পরিবারসহ চট্টগ্রামে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৭ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের Emory University-তে পাড়ি জমান এবং ১৯৭৫ সালে পিএইচডি অর্জন করেন।

কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় কেবল শিক্ষাবিদে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সমাজ পরিবর্তনের এক নিরলস যোদ্ধা। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘দীপশিক্ষা বিদ্যালয়’, যেখানে ছিন্নমূল শিশু ও নারীরা খুঁজে পায় নতুন জীবনের আলো। প্রতিবন্ধী শিশু ও নারীদের জন্য তিনি গড়ে তোলেন ‘সোসাইটি ফর দ্য কেয়ার অ্যান্ড এডুকেশন ফর মেন্টালি রিটার্ড চিলড্রেন’, যা পরবর্তীতে ‘সুইড বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত হয়। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন, যা আজও তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সাক্ষ্য বহন করে।

১৯৭৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে শিক্ষা জগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘স্পেশাল এডুকেশন’ বিভাগ, যা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে গণ্য।

সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পান বেগম রোকেয়া পুরস্কার, যা তাঁর কর্মময় জীবনের প্রতি জাতির শ্রদ্ধাঞ্জলি।

২০২০ সালের ২২ মার্চ তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। তবুও তাঁর আদর্শ, মানবিকতা ও শিক্ষার আলো আজও জীবন্ত। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর আলো প্রতিটি শিক্ষার স্পর্শে, সহমর্মিতার প্রয়াসে এবং মানবিক উদ্যোগে ছড়িয়ে আছে।

অধ্যাপক সুলতানা জামানের জীবন ও অবদান (সংক্ষেপে)

বিষয়বিবরণ
জন্ম৯ জুন ১৯৩২, ঝিনাইদহ
পিতা-মাতাখান বাহাদুর সিরাজুল ইসলাম ও রাহাত আরা বেগম
শিক্ষাগত যোগ্যতাঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (স্নাতকোত্তর), Emory University (PhD, 1975)
গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানদীপশিক্ষা বিদ্যালয়, সুইড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন
বিশ্ববিদ্যালয় পদঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রভাষক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক
বিশেষ অবদানঅন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও সহায়তা
সম্মাননাবেগম রোকেয়া পুরস্কার
প্রয়াণ২২ মার্চ ২০২০

অধ্যাপক সুলতানা জামানের জীবন প্রমাণ করে যে শিক্ষার আলো ও মানবিকতার সংকল্প কেবল ব্যক্তি জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি সমাজকে আলোকিত করে, মানুষকে উদ্দীপ্ত করে এবং প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে।