স্বাধীনতা–পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রশ্নবিদ্ধ: শিবির সেক্রেটারি

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে রচিত ইতিহাসের একটি বড় অংশই ‘মিথ্যা বয়ান দিয়ে লেখা হয়েছে’—এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এই মন্তব্য করেন, যা উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

বিজয় দিবস উপলক্ষে ‘বিজয়ের ৫৪ বছর, স্বাধীনতার আলোয় আগামীর নির্মাণ’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনীতি এবং রাষ্ট্রগঠনের নানা প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হয়।

সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম প্রশ্ন তোলেন, স্বাধীনতার পরপরই যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন, তারা কেন তৎকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন করেননি। তিনি বলেন, সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন সরকারের শাসনামলে একাধিকবার নতুন নতুন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গোপন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ চলেছে। তাঁর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি বিশেষ গোষ্ঠী আর্থিক সুবিধা আদায় করেছে এবং একই সঙ্গে জাতির ভেতরে বিভাজনের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। তিনি একে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে আখ্যা দেন।

ছাত্রশিবিরের ভূমিকা তুলে ধরে নুরুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইসলামী ছাত্রশিবির স্বাধীনতার চেতনা ধারণ করে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করে আসছে। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে, যাকে তিনি ‘ফ্যাসিবাদী সময়’ হিসেবে উল্লেখ করেন, বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে শিবিরের নেতা–কর্মীদের নিয়মিত গ্রেপ্তার হতে হয়েছে। প্রতিবছরই র‍্যালি শেষে কতজন কর্মী আটক হয়েছেন, তার হিসাব করতে হতো বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট টেনে নুরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘মহান আল্লাহ ১৯৭১ সালে আমাদের পাকিস্তানের শোষণ থেকে মুক্ত করেছেন। একইভাবে আমরা বিশ্বাস করি, ২০২৪ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমরা আধিপত্যবাদের গ্রাস থেকেও মুক্ত হয়েছি।’ তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিক পরিসরে নতুন বিতর্ক উসকে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সেমিনারে অতিথি বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশের (আপ বাংলাদেশ) প্রধান সমন্বয়কারী রাফে সালমান রিফাত। তিনি বলেন, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ উত্থান–পতন, আন্দোলন ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। এই পথে জাতিকে বিপুল আত্মত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী যে নির্বিচারে বাঙালিদের ওপর নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। একই সঙ্গে ইতিহাসের শুরুর দিকের কিছু অস্বস্তিকর বাস্তবতা, যেমন বিহারিদের ওপর সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও আলোচনায় আনা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রসঙ্গে রাফে সালমান রিফাত বলেন, তাঁকে নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা, বিতর্ক ও পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তাই ইতিহাসচর্চায় আবেগের পরিবর্তে বস্তুনিষ্ঠতা জরুরি—ভালোকে ভালো এবং খারাপকে খারাপ বলার সৎ সাহস থাকতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদ বলেন, ইসলামী ছাত্রশিবির শুধু এ বছর নয়, প্রতিবছরই স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস পালন করে আসছে। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিনের দমন–পীড়নের মধ্যেও শিবিরের নেতা–কর্মীরা জাতীয় দিবস পালনে অটল থেকেছেন এবং এর জন্য বহুবার গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।

সেমিনার সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত তথ্য

বিষয়তথ্য
আয়োজনইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা
উপলক্ষবিজয় দিবস
শিরোনামবিজয়ের ৫৪ বছর, স্বাধীনতার আলোয় আগামীর নির্মাণ
স্থানসিরাজুল ইসলাম লেকচার হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রধান বক্তানুরুল ইসলাম সাদ্দাম
অতিথি বক্তারাফে সালমান রিফাত