স্তন ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন গেম-চেঞ্জার পরীক্ষা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বের প্রায় ২৩ লাখ নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। স্তন ক্যানসার এখন বিশ্বের মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যাওয়া ক্যানসারের মধ্যে একটি। রোগের ধরণ, পর্যায় ও রোগীর স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুসারে এর চিকিৎসার ফলাফল ভিন্ন হয়। সাধারণত চিকিৎসার পদ্ধতি হিসেবে সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন, ইমিউনোথেরাপি এবং নির্দিষ্ট ধরণের ক্যানসারের জন্য টার্গেটেড থেরাপি ব্যবহৃত হয়। তবে কোন রোগীর ক্ষেত্রে কোন চিকিৎসা কার্যকর হবে তা আগেভাগে অনুমান করা প্রায়শই কঠিন হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি ‘ক্লিনিক্যাল ক্যানসার রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় নতুন ধরনের ‘লিকুইড বায়োপসি’ পরীক্ষার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এই পরীক্ষা অ্যাডভান্সড স্তন ক্যানসারের রোগীদের মধ্যে নির্দিষ্ট টার্গেটেড থেরাপির কার্যকারিতা আগেভাগে নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।

রক্ত পরীক্ষা থেকে শনাক্ত করা হবে ctDNA

গবেষণার অংশ হিসেবে ‘প্লাজমাম্যাচ’ ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ১৭৬ জন অ্যাডভান্সড স্তন ক্যানসার রোগীর রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকরা রক্তে ‘সার্কুলেটিং টিউমার ডিএনএ’ বা ctDNA শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। ctDNA হলো ক্যানসার কোষ থেকে নিঃসৃত ক্ষুদ্র ডিএনএ অংশ যা রক্তপ্রবাহে থাকে।

রোগীদের স্তন ক্যানসারের ধরন এবং জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুসারে দুটি দলে ভাগ করা হয়:

দলরোগীর সংখ্যাবৈশিষ্ট্য
প্রথম দল৮২ESR1, HER2, AKT1, AKT বা PTEN জিনগত পরিবর্তনযুক্ত রোগী
দ্বিতীয় দল৯৪‘ট্রিপল নেগেটিভ’ স্তন ক্যানসার, কোনো লক্ষ্যযোগ্য জিনগত পরিবর্তন নেই

চিকিৎসার আগে এবং শুরু হওয়ার চার সপ্তাহ পর রক্তে ctDNA পরিমাণ পরিমাপ করা হয়।

ctDNA: চিকিৎসার পূর্বাভাসের শক্তিশালী বায়োমার্কার

প্রথম দলে দেখা গেছে, চার সপ্তাহ পর যাদের রক্তে ctDNA নেই, তাদের ক্যানসার প্রায় ১০.৬ মাস পর্যন্ত স্থিতিশীল ছিল। ctDNA-উচ্চ রোগীদের ক্ষেত্রে এটি মাত্র ৩.৫ মাস। একই দলের রোগীদের মধ্যে, ctDNA কম থাকা রোগীর ৪৬.২% চিকিৎসায় ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে, যেখানে উচ্চ ctDNA-র ক্ষেত্রে মাত্র ৭.৯%।

দ্বিতীয় দলে দেখা গেছে, ctDNA কম থাকা রোগীর প্রোগ্রেসন-ফ্রি সারভাইভাল প্রায় ১০.২ মাস, আর উচ্চ ctDNA-র ক্ষেত্রে ৪.৪ মাস। ctDNA কম থাকা রোগীর ৪০% চিকিৎসায় সফল হয়, কিন্তু উচ্চ ctDNA-র রোগীর মাত্র ৯.৭%। বিশেষভাবে, ctDNA সম্পূর্ণভাবে না থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে ক্যানসার প্রায় ১২ মাস নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং ৮৫.৭% রোগী চিকিৎসায় ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য

লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের ডা. আইসল্ট ব্রাউন বলেন, “রক্তে ctDNA পর্যবেক্ষণ করে বোঝা সম্ভব রোগী থেরাপিতে কতটা সাড়া দেবেন।”

ডা. রিচার্ড রেইথারম্যান, মেমোরিয়ালকেয়ার ব্রেস্ট সেন্টারের ব্রেস্ট ইমেজিং বিভাগের মেডিক্যাল ডিরেক্টর, বলেন, “মেটাস্ট্যাটিক স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার কার্যকারিতা নিরীক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ctDNA-র মাত্রা দেখে চিকিৎসার প্রাথমিক সাড়া নির্ধারণ সম্ভব।”

ডা. রিচার্ড জেলকোভিটস, হার্টফোর্ড হেলথকেয়ার ক্যানসার ইনস্টিটিউটের ব্রেস্ট অনকোলজি বিভাগের মেডিক্যাল ডিরেক্টর, মন্তব্য করেন, “একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা দিয়ে জানা যায় কোন রোগী চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন, তা চিকিৎসা পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সাহায্য করবে। এটি একটি প্রকৃত গেম-চেঞ্জার।”

গবেষকরা আশা করছেন, এই লিকুইড বায়োপসি পরীক্ষা শুধুমাত্র রোগ নির্ণয় ও পর্যবেক্ষণই নয়, বরং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা এবং জীবনমান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।