সৌদি-তুরস্ক সম্পর্কের নতুন কৌশলগত অধ্যায়

মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সৌদি আরব ও তুরস্কের সম্পর্ক এক নতুন কৌশলগত মাত্রা পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের রিয়াদ সফর দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিকে আরও দৃঢ় করার ইঙ্গিত দিয়েছে। কয়েক বছর আগেও যে সম্পর্ক তীব্র টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল, আজ তা পুনর্গঠিত হচ্ছে বাস্তববাদী কূটনীতি ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে।

২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর আঙ্কারা-রিয়াদ সম্পর্ক মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটে। তুরস্ক বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালোভাবে উত্থাপন করলে সৌদি আরব কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়ে। সে সময় রিয়াদ আঞ্চলিক রাজনীতিতে তুলনামূলক সংযত অবস্থান নেয় এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কার কর্মসূচিতে মনোনিবেশ করে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বহুমুখীকরণের উদ্যোগ জোরদার হয়। পর্যটন, প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঞ্চলিক সংকট—ইয়েমেন যুদ্ধ, গাজা পরিস্থিতি, লোহিত সাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সুদানের অস্থিরতা—সৌদি আরবকে আবার সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকায় ফিরিয়ে এনেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে রিয়াদ বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী। বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে। প্রতিরক্ষা শিল্প, বিশেষত ড্রোন প্রযুক্তি, সাঁজোয়া যান ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে তুরস্কের সাফল্য সৌদি আরবের কাছে আকর্ষণীয়। এছাড়া নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে তুর্কি কোম্পানিগুলোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রা সংকটের চাপে থাকা তুরস্কের জন্য সৌদি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায়ও আঙ্কারা বাস্তববাদী নীতি অনুসরণ করছে।

সম্প্রতি দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে সোমালিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা, গাজায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, সুদানের স্থিতিশীলতা এবং সিরিয়া সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপের অঙ্গীকার করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, সম্পর্ক কেবল অর্থনীতি বা বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিরাপত্তা, কৌশল ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রশ্নেও বিস্তৃত হচ্ছে।

নিচের সারণিতে দুই দেশের ঘনিষ্ঠতার প্রধান ক্ষেত্র ও লক্ষ্য তুলে ধরা হলো—

ক্ষেত্রসৌদি আরবের লক্ষ্যতুরস্কের আগ্রহ
আঞ্চলিক নিরাপত্তাইয়েমেন ও লোহিত সাগরে প্রভাব বৃদ্ধিমধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক প্রভাব সম্প্রসারণ
অর্থনীতিতেলনির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখীকরণবিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ
প্রতিরক্ষাআধুনিক প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিপ্রতিরক্ষা শিল্প রপ্তানি
আফ্রিকা ও গাজাকূটনৈতিক সক্রিয়তা ও মানবিক ভূমিকামুসলিম বিশ্বে নেতৃত্বের ভাবমূর্তি

কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, সম্ভাব্য সৌদি-পাকিস্তান সামরিক সমন্বয়ে তুরস্ক যুক্ত হলে একটি নতুন শক্তি-অক্ষ গড়ে উঠতে পারে। যদিও তা এখনো আনুষ্ঠানিক রূপ পায়নি, তবু এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরব ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়; বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনীতির পুনর্গঠনের অংশ। এই অংশীদারত্ব কতটা স্থায়ী ও কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে পারস্পরিক আস্থা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং চলমান সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত সক্ষমতার ওপর। সময়ই বলে দেবে, এই নতুন সমীকরণ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কতটা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।