সেন্ট-ম্যাক্সিমিন ও তাঁর সন্তানদের প্রতি বর্ণবাদী আচরণের নিন্দা

ফরাসি উইঙ্গার অ্যালান সেন্ট-ম্যাক্সিমিনকে কেন্দ্র করে ফুটবল বিশ্বে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিতর্কিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মেক্সিকোর শীর্ষ লিগে খেলাকালীন তাঁর সন্তানদের ওপর বর্ণবাদী আক্রমণের পর তিনি ফ্রান্সে ফিরে আসলেও সেখানেও তাঁকে অনলাইন হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তাঁর বর্তমান ক্লাব আরসি লেন্স। মেক্সিকোর ক্লাব আমেরিকা ছেড়ে শীতকালীন দলবদল উইন্ডোতে ছয় মাসের চুক্তিতে লেন্স-এ যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বর্ণবাদী মন্তব্যের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মেক্সিকো ত্যাগ

২৮ বছর বয়সী এই ফরাসি তারকা গত আগস্টে সৌদি আরবের আল-আহলি থেকে ধারে মেক্সিকান ক্লাব আমেরিকাতে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে দুই বছরের চুক্তির প্রথম বছরেই তিনি ১৬টি লিগ ম্যাচ খেলেন। তবে সেখানে অবস্থানকালে তাঁর পরিবার, বিশেষ করে তাঁর তিন সন্তান— দুই কন্যা লিয়ানা ও নিনহিয়া এবং পুত্র দাইদে— বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়। সন্তানদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি মেক্সিকো ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। সেন্ট-ম্যাক্সিমিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বার্তায় বলেন, “সমস্যা গায়ের রঙে নয়, সমস্যা চিন্তার রঙে। আমাকে আক্রমণ করা হলে আমি সহ্য করতে পারি, কিন্তু আমার সন্তানদের ওপর কোনো আক্রমণ আমি মেনে নেব না।”

লেন্স ক্লাবের অবস্থান ও কঠোর ব্যবস্থা

মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে লেন্স কর্তৃপক্ষ জানায়, সেন্ট-ম্যাক্সিমিনকে উদ্দেশ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “ঘৃণ্য এবং বর্ণবাদী অপমানের বন্যা” বয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্লাবটি তাদের নির্দিষ্ট কিছু পোস্টের কমেন্ট সেকশন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। নিচে অ্যালান সেন্ট-ম্যাক্সিমিনের সাম্প্রতিক ক্যারিয়ার ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের একটি তালিকা দেওয়া হলো:

বিষয়বিস্তারিত তথ্য
বর্তমান ক্লাবআরসি লেন্স (ফ্রান্স)
সাবেক ক্লাবক্লাব আমেরিকা (মেক্সিকো), নিউক্যাসেল, নিস, মোনাকো
আক্রমণের ধরনসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্ণবাদী গালাগাল ও ব্যক্তিগত আক্রমণ
পরিবারস্ত্রী এবং তিন সন্তান (লিয়ানা, নিনহিয়া ও দাইদে)
লেন্স ক্লাবের পদক্ষেপকমেন্ট সেকশন বন্ধ এবং আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি
খেলোয়াড়ের প্রতিক্রিয়াসন্তানদের সুরক্ষায় আপসহীন অবস্থান ও ধর্মীয় বিশ্বাসে অনড় থাকা

বর্ণবাদ ও ফুটবল: পরিসংখ্যানের এক ঝলক

ফুটবল মাঠে এবং অনলাইনে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের প্রতি বর্ণবাদী আক্রমণ বিশ্বজুড়ে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। ফিফা এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফুটবলারদের ওপর হওয়া বর্ণবাদী আক্রমণের হার গত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

  • অনলাইন হ্যারাসমেন্ট: ২০২২ বিশ্বকাপের পর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৫০% কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় কোনো না কোনোভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্ণবাদী মন্তব্যের শিকার হন।

  • মেক্সিকান ফুটবল লিগ (Liga MX): মেক্সিকোর লিগে গত মৌসুমে বর্ণবাদী অভিযোগের হার আগের চেয়ে প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সেন্ট-ম্যাক্সিমিনের মতো বিদেশি খেলোয়াড়দের জন্য নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি করেছে।

  • ইউরোপীয় ফুটবল: উয়েফা (UEFA) গত বছর বিভিন্ন লিগে বর্ণবাদী ঘটনার জন্য ক্লাবগুলোকে কয়েক মিলিয়ন ইউরো জরিমানা করেছে, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বেনামী আইডির কারণে অপরাধীদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও সংহতি

লেন্স ক্লাবটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, তারা একটি নাগরিক-সচেতন এবং দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্মান ও সহনশীলতার মূল্যবোধে বিশ্বাসী। তারা অ্যালান এবং তাঁর পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে। সেন্ট-ম্যাক্সিমিন সাহসের সাথে জানিয়েছেন যে, পৃথিবীর কোনো হুমকি তাঁকে ভয় দেখাতে পারবে না এবং তিনি কেবল সৃষ্টিকর্তাকেই ভয় করেন। এই ঘটনাটি ফুটবল বিশ্বকে পুনরায় মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বর্ণবাদ বিরোধী লড়াইয়ে এখনও অনেকটা পথ যাওয়া বাকি।