মৃত্যু কখনও কখনও কেবল ব্যক্তির জীবনের সমাপ্তি নয়, এটি একটি যুগের বিদায়ের প্রতীকও বটে। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ এমনই একটি দিন ছিল, যখন বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার এক অমর আলোকবর্তিকা সন্জীদা খাতুন আমাদের থেকে চিরবিদায় নেন। তাঁর সৃষ্টিকর্ম, শিক্ষাদীক্ষা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ আজও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তাঁর অবদান কেবল সঙ্গীত জগতে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছিলেন শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের জন্য অনন্য প্রেরণার উৎস।
এই গভীর শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণের জন্য রাজধানীর ছায়ানট সংস্কৃতিভবনের নিচতলায় গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত হলো ‘গানে গানে শ্রদ্ধার্ঘ্য’ আয়োজন। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে উপস্থিত ছিলেন সন্জীদা খাতুনের দীর্ঘদিনের সহকর্মী, শিষ্য ও শুভানুধ্যায়ীরা। পুরো পরিবেশটি হয়ে ওঠে স্মৃতি, ভালোবাসা ও সাংস্কৃতিক সংহতির এক অনন্য মেলবন্ধন। অনুষ্ঠানে ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী এবং সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল সমবেত সঙ্গীত। মোট ১৫টি গান পরিবেশিত হয়, যা সন্জীদা খাতুনের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে আত্মস্থ হয়। উল্লেখযোগ্য গানগুলো নিম্নরূপ:
| ক্রমিক | গান | স্মৃতিচারণের রূপ |
|---|---|---|
| ১ | তোমার সুরের ধারা | শিক্ষার্থী ও শিল্পীর প্রেরণা প্রকাশ |
| ২ | গানের ভিতর দিয়ে | সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন |
| ৩ | গানে গানে তব বন্ধন | বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার অভিব্যক্তি |
| ৪ | আমি কী বলে করিব নিবেদন | শিল্পীর আত্মার গভীর আবহ প্রকাশ |
প্রতিটি গানের সঙ্গে জড়িত ছিল ব্যক্তিগত স্মৃতি, শিক্ষালাভের গর্ব এবং সাংস্কৃতিক দায়িত্বের প্রতিশ্রুতি। এছাড়া অনুষ্ঠানে একটি দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন অনুষ্ঠানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক ছিল বাদ্যযন্ত্রের সরলতা। প্রচলিত বাদ্যযন্ত্রের জৌলুস এড়িয়ে কেবল ব্যবহৃত হয়েছিল তানপুরা ও মন্দিরা। এই সরলতা গানের মর্ম, কণ্ঠের গভীরতা এবং অনুভূতির স্বচ্ছতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। সুরের সংযম ছিল শ্রদ্ধার সবচেয়ে নির্মল প্রকাশ।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে শোনা যায় সন্জীদা খাতুনের নিজস্ব কণ্ঠে গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত ‘জানি জানি গো দিন যাবে’ এর অডিও। কণ্ঠের ছন্দে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে যান। মনে হয়, তিনি এখনও আমাদের সঙ্গে আছেন—সঙ্গীতে, শিক্ষায় এবং প্রতিটি হৃদয়ে।
সন্জীদা খাতুনের স্মৃতিচারণ এই আয়োজন প্রমাণ করল যে, সত্যিকারের শিল্পী ও শিক্ষকের অবদান কখনো মরতে পারে না। তাঁর সঙ্গীত, শিক্ষাদীক্ষা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ চিরকাল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জীবিত থাকবে এবং নতুন শিক্ষার্থী ও শিল্পীদের জন্য অনন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
