বাংলা গানের স্বর্ণালি যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারিগর, প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত পরিচালক মো. শাহ নেওয়াজ আর নেই। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৩টা ৩৩ মিনিটে কানাডার মন্ট্রিয়ালের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। তাঁর মৃত্যুর সংবাদটি গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন তাঁর পুত্র স্বদেশ নেওয়াজ। গুণী এই সুরকারের প্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
Table of Contents
শেষ দিনগুলো ও বিদায় বেলা
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শাহ নেওয়াজ দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে মন্ট্রিয়ালের রয়েল ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ দুই মাস তিনি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েছেন। চিকিৎসাকালীন বেশ কয়েকবার তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছিল। তবে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সুরের এই মহান জাদুকর পাড়ি জমালেন না-ফেরার দেশে।
নিভৃতচারী এক সুরস্রষ্টার কীর্তি
শাহ নেওয়াজ ছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানের একজন নিরলস সাধক। প্রচারের চাকচিক্য থেকে সব সময় নিজেকে দূরে রাখতে পছন্দ করতেন এই গুণী শিল্পী। তবে নিভৃতে থেকেও তিনি এমন সব সুর সৃষ্টি করেছেন, যা বাংলা গানের ইতিহাসে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছে। বিশেষ করে আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকে ব্যবহৃত তাঁর সুর করা গানগুলো প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছে। তাঁর সুরের বৈশিষ্ট্য ছিল পরিমিতিবোধ এবং এক ধরনের বিষাদময় গভীরতা, যা শ্রোতাকে নিমেষেই স্মৃতিকাতর করে তোলে।
শাহ নেওয়াজের সুর করা কয়েকটি কালজয়ী গানের তালিকা
| গানের প্রথম চরণ | গীতিকার | কণ্ঠশিল্পী | মন্তব্য |
| আশা ছিল মনে মনে | জহির রায়হান ও নূরুজ্জামান শেখ | রফিকুল আলম | কালজয়ী আধুনিক গান |
| রেললাইন বহে সমান্তরাল | নজরুল ইসলাম বাবু | দিলরুবা খান ও মলয় কুমার | ‘একদিন যখন’ নাটকের গান |
| বন্ধু রে তোর মন পাইলাম না | সংগৃহীত/গীতিকার | শাহনাজ রহমতুল্লাহ | গভীর আবেগের সুর |
| মাটির জায়নামাজ | সংগৃহীত/গীতিকার | শাহনাজ রহমতুল্লাহ | আধ্যাত্মিক আবেশের গান |
| দুই ভুবনে দুই বাসিন্দা | নজরুল ইসলাম বাবু | মলয় কুমার গাঙ্গুলী | জনপ্রিয় টিভি নাটকের গান |
শিল্পী ও সৃষ্টির ব্যাপ্তি
শাহ নেওয়াজের সুরে কণ্ঠ দেওয়া যেন সে সময়ের শিল্পীদের কাছে এক পরম প্রাপ্তি ছিল। দেশের প্রায় সকল কিংবদন্তি শিল্পী তাঁর সুরে গান গেয়েছেন। মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার, সৈয়দ আব্দুল হাদী, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রজন্মের এন্ড্রু কিশোর—সবার কণ্ঠে তাঁর সুর পেয়েছে অনন্য উচ্চতা। তাঁর সুরের যাদু কেবল দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা এবং হৈমন্তী শুক্লাও তাঁর সুরে গান গেয়ে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন।
পারিবারিক জীবন ও শেষ বিদায়
ব্যক্তিজীবনে শাহ নেওয়াজ অত্যন্ত বিনয়ী ও অমায়িক মানুষ ছিলেন। তিনি স্ত্রী, এক কন্যা, দুই পুত্র এবং দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য গুণগ্রাহী ও ছাত্র রেখে গেছেন। তাঁর পুত্র জানিয়েছেন, কানাডার মন্ট্রিয়ালেই তাঁর জানাজা শেষে স্থানীয় একটি কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শাহ নেওয়াজ শারীরিক ভাবে বিদায় নিলেও ‘আশা ছিল মনে মনে’ কিংবা ‘রেললাইন বহে সমান্তরাল’-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টিগুলোর মাধ্যমে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। বাংলা গানের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে পড়লেও তাঁর রেখে যাওয়া সুরের মায়াজালে তিনি অক্ষয় হয়ে থাকবেন সংগীতপ্রেমীদের অন্তরে।
