বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে যাঁরা পথিকৃত, যাঁদের হাত ধরে নারীর সাহসী উপস্থিতি রূপালী পর্দায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—সুমিতা দেবী তাঁদের অগ্রভাগে ছিলেন। তিনি কেবল প্রথিতযশা অভিনেত্রী নন, ছিলেন চলচ্চিত্র প্রযোজক ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা। জীবনভর তিনি বাঙালি নারীর আত্মমর্যাদা, শিল্পসত্তা এবং সংগ্রামী চেতনাকে বহন করেছেন।
সুমিতা দেবীর জন্ম ১৯৩৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জ জেলার দক্ষিণ খল্লি গ্রামে। পারিবারিক নাম হেনা ভট্টাচার্য। চলচ্চিত্র ‘আসিয়া’-তে অভিনয়ের সময় পরিচালক ফতেহ লোহানী তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন—সুমিতা, যা পরবর্তীকালে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক স্বীকৃত ও সম্মানিত পরিচয় হয়ে ওঠে।
১৯৬২ সালে কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ও কথাসাহিত্যিক জহির রায়হানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি প্রথম স্বামী ফরিদপুরের কমিউনিস্ট নেতা অতুল লাহিড়ীর সংসারেও ছিলেন, যেখানে জন্ম নেন শিশু অভিনেতা মাঃ কল্লোল রায়হান। জহির রায়হানের সংসারে দুই পুত্র—লেখক ও নাট্যনির্মাতা বিপুল রায়হান এবং সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী অনল রায়হান।
ষাটের দশকে ঢাকার চলচ্চিত্র জগতে সুমিতা দেবী ছিলেন অগ্রগণ্য নারীব্যক্তিত্ব। ১৯৫৭ সালে ফতেহ লোহানীর ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবন শুরু হয়। এরপর ‘আকাশ আর মাটি’ (১৯৬০), ‘কখনো আসেনি’, ‘সোনার কাজল’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘এই তো জীবন’, ‘দুই দিগন্ত’, ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘অভিশাপ’, ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘বেহুলা’, ‘স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা’, ‘ওরা ১১ জন’ এবং ‘আমার জন্মভূমি’—এভাবে প্রায় ১০টি প্রধান চলচ্চিত্রে এবং শতাধিক চলচ্চিত্রে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেন।
তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে নির্মিত ‘ধূপছাঁও’ চলচ্চিত্রসহ পূর্ব পাকিস্তানের একাধিক উর্দু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। বেতার, টেলিভিশন ও মঞ্চনাটকেও তিনি সমানভাবে সফল ছিলেন। প্রযোজক হিসেবেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য; তিনি প্রযোজনা করেছেন ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘মোমের আলো’, ‘মায়ার সংসার’, ‘আদর্শ ছাপাখানা’ ও ‘নতুন প্রভাত’ চলচ্চিত্র।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সুমিতা দেবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন নিয়মিত শিল্পী হিসেবে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। শিল্পকে অস্ত্র করে তিনি মুক্তিকামী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
প্রাপ্ত সম্মাননা ও পুরস্কার
| বছর | পুরস্কার/সম্মাননা | বর্ণনা |
|---|---|---|
| ১৯৬২ | অল পাকিস্তান ক্রিটিক অ্যাওয়ার্ড | অভিনয়ের স্বীকৃতি |
| ১৯৬৩ | নিগার পুরস্কার | শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে |
| ১৯৭২-১৯৭৫ | বাচসাস পুরস্কার | স্বাধীনতার পর চলচ্চিত্রে অবদান |
| ২০০২ | আগরতলা মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কার | মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক অবদানের জন্য |
| ২০০২ | জনকণ্ঠ গুণীজন ও প্রতিভা সম্মাননা | সার্বিক শিল্পী জীবন স্বীকৃতি |
২০০৪ সালের ৬ জানুয়ারি বাংলা চলচ্চিত্রের এই “ফার্স্ট লেডি” শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে মীরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
সুমিতা দেবী ছিলেন এক যুগের প্রতীক, সাহসী পথচলা এবং বাঙালি নারীর শিল্পীসত্তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও প্রেরণা জোগায় নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও সংগ্রামী নারীদের।
