সুপরিকল্পিত প্রযুক্তিনির্ভর অভিযানে হত্যা করা হয় খামেনিকে

গত সপ্তাহান্তে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার এক সুপরিকল্পিত সামরিক অভিযানে নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। অভিযানের সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কৌশলগত প্রস্তুতি এবং উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই অভিযান বাস্তবায়িত হয় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ইরান ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি এক নাটকীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ব্যবহার

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, তেহরানের বিস্তৃত সড়ক নজরদারি ক্যামেরা নেটওয়ার্ক কয়েক বছর আগে গোপনে অনুপ্রবেশের শিকার হয়। শহরের সরু গলি, প্রধান সড়ক ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে স্থাপিত ক্যামেরাগুলো থেকে সংগৃহীত চিত্র বিশ্লেষণ করে শীর্ষ নেতাদের চলাচলের ধরন, সময়সূচি এবং নিরাপত্তা রুটিন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযানে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়, যা বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করে কার্যকর নির্দেশনায় রূপান্তর করত। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গণনাযন্ত্রে বিশ্লেষণ করে চৌদ্দ অঙ্কের নির্ভুল স্থানাঙ্ক নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।

নিম্নে ব্যবহৃত তথ্যের ধরন ও উৎস তুলে ধরা হলো—

তথ্যের ধরনউৎসউদ্দেশ্য
মানব গোয়েন্দা তথ্যগুপ্তচর নেটওয়ার্কচলাচলের ধরন বিশ্লেষণ
সংকেত গোয়েন্দা তথ্যটেলিফোন ও ইলেকট্রনিক যোগাযোগনির্ভুল অবস্থান শনাক্তকরণ
অনুপ্রবেশকৃত বার্তাইমেইল ও বার্তা আদান-প্রদান মাধ্যমপরিকল্পনা ও যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ
উপগ্রহ চিত্রমহাকাশভিত্তিক সংবেদকএলাকা পর্যবেক্ষণ ও কৌশলগত মূল্যায়ন
সড়ক নজরদারি চিত্রনগর ক্যামেরা নেটওয়ার্কগতিবিধি ও অবস্থান বিশ্লেষণ

প্রযুক্তিবিদ, তথ্য বিশ্লেষক ও প্রকৌশলীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টায় এই সমন্বিত ব্যবস্থা প্রায় নিখুঁত পর্যায়ে উন্নীত করা হয় বলে জানা গেছে।

অভিযানের বাস্তবায়ন

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানান, গত বছরের জুন মাসে খামেনিকে লক্ষ্য করে একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ সে সময় তিনি একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে অবস্থান করছিলেন। সর্বশেষ অভিযানে দিনের আলোয় নিজেকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করে তিনি বাইরে অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করা হয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করা হলে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান নির্ধারিত স্থানাঙ্কে ত্রিশটি বোমা নিক্ষেপ করে।

প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা আঘাত

রবিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। এর পরপরই ইরান কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক কার্যক্রম কেন্দ্র লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনাসদস্য হতাহত হয়েছেন বলে জানানো হয়। মার্কিন জেনারেল ড্যান কেন বলেন, হামলাটি শুয়াইব বন্দর এলাকার একটি অস্থায়ী স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছিল।

কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট

১১ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয় এবং আলোচনা ব্যর্থ হলে সম্ভাব্য বিকল্প পরিকল্পনা নিয়েও মতবিনিময় করা হয়। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অভিযানের চূড়ান্ত অনুমোদন দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে এবং ইরান-ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধকে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ দিতে পারে। ফলে সমগ্র অঞ্চলে নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।