সীমান্তে আটক আজিজুরের মর্মান্তিক মৃত্যু

সীমান্তে ঘাস কাটতে গিয়ে বাংলাদেশি দিনমজুর আজিজুর রহমান (৪৬) ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর হাতে আটক হওয়ার পর দীর্ঘ প্রায় ১১ মাসের বন্দিজীবন ও চিকিৎসার পর মৃত্যুবরণ করেছেন। অবশেষে শুক্রবার তার মরদেহ বাংলাদেশে ফেরত আসে, তবে জীবিত অবস্থায় নয়—একটি নিথর দেহ হিসেবে। এ ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় নতুন করে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

আজিজুর রহমান ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলার ধর্মগড় ইউনিয়নের শাহানাবাদ গ্রামের মরতুজ আলীর ছেলে। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার পরিবারে রয়েছে দুই কন্যা এবং এক মানসিক প্রতিবন্ধী পুত্র। দরিদ্র এই পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৩ মে শাহানাবাদ সীমান্তের ৩৭৩/১-এস পিলার এলাকায় ঘাস কাটতে গেলে ভারতের ১৮৪ আমবাড়ী ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা তাকে আটক করে। পরিবারের দাবি, এটি ছিল জিরো পয়েন্ট এলাকার কাছাকাছি এবং তিনি বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন।

তার স্ত্রী তাছকারা বেগম অভিযোগ করেন, আটক করার পর তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়, এতে তার একটি পা ভেঙে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হলেও কিছুদিন পর শিলিগুড়ি জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

দীর্ঘ কারাবাসের সময় অবস্থার অবনতি হলে ২০২৬ সালের ২২ মার্চ তাকে শিলিগুড়ি সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় একই দিন আনুমানিক বিকেল ৫টায় তার মৃত্যু হয় বলে জানা যায়।

পরিবারের অভিযোগ, এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয় বরং নির্যাতনের ধারাবাহিকতায় ঘটে যাওয়া একটি হত্যাকাণ্ড। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।

ঘটনাপ্রবাহ সংক্ষিপ্ত বিবরণ

তারিখ/সময়ঘটনাস্থান
২০২৫ সালের ১৩ মেঘাস কাটতে গিয়ে বিএসএফের হাতে আটকশাহানাবাদ সীমান্ত, ঠাকুরগাঁও
মে ২০২৫মারধরের পর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তিভারতীয় সীমান্ত এলাকা
পরবর্তীতেশিলিগুড়ি জেলা কারাগারে প্রেরণপশ্চিমবঙ্গ, ভারত
২০২৬ সালের ২২ মার্চঅসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে স্থানান্তর ও মৃত্যুশিলিগুড়ি সদর হাসপাতাল
২০২৬ সালের ৪ এপ্রিলমরদেহ বাংলাদেশে হস্তান্তরবাংলাবান্ধা সীমান্ত

শুক্রবার বিকেলে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে বিজিবি ও বিএসএফ-এর উপস্থিতিতে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। এ সময় তেঁতুলিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম, বিজিবির বাংলাবান্ধা বিওপির কোম্পানি কমান্ডার এবং কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

পরে মরদেহ আজিজুরের জামাতা দুলাল হোসেন ও ভাতিজা সোহেল রানার কাছে হস্তান্তর করা হয়। তারা মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। শনিবার শাহানাবাদ গ্রামে তার দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আবুল কাশেম জানান, পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র। তাদের কোনো সম্পদ নেই। তার ভাষ্যমতে, সীমান্তে ধস্তাধস্তির সময় আজিজুর আহত হন এবং পরবর্তীতে কারাগারেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।

অন্যদিকে ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানজির আহমেদ জানান, দুই দেশের প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে এবং পরিবারের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনার পর সীমান্তে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। মানবাধিকারকর্মীরা এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।