সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক: সিদ্ধান্ত নেবে নতুন সংসদ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এখন সব মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে ভোট কি বিগত বছরগুলোর মতো দলীয় প্রতীকে হবে, নাকি পূর্বের ন্যায় নির্দলীয় বা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফিরে যাবে— তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীদের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন জানিয়েছে, সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ভাগ্য এখন নবগঠিত জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর ঝুলে আছে।


নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ও আইনি প্রেক্ষাপট

আজ রোববার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে একটি অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নের বিধানটি স্থগিত বা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, যেকোনো অধ্যাদেশকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে নবনির্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেটি অনুমোদিত হতে হয়।

নির্বাচন কমিশনারের ভাষ্যমতে:

“সংসদ বসার পর যদি এই বিল বা অর্ডিন্যান্সটি সংসদ সদস্যদের সম্মতিতে রেটিফাই (অনুমোদন) হয়, তবে দলীয় প্রতীক ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর যদি সংসদ এটি অনুমোদন না করে এবং আইনটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়, তবে দলীয় প্রতীকেই ভোট হবে। আমরা মূলত সংসদীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।”

বর্তমানে জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। ফলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দলীয় প্রতীকের উপস্থিতি থাকবে কি না, তা মূলত এই সংসদ এবং বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে।


সংরক্ষিত নারী আসনের প্রস্তুতি

সংসদ অধিবেশন শুরুর পাশাপাশি সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন নিয়েও তৎপরতা শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। আবদুর রহমানেল মাছউদ জানান, সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের পর থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করার একটি আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কমিশন সেই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো তাদের প্রাপ্ত সাধারণ আসনের আনুপাতিক হারে নারী সদস্য মনোনীত করবেন।

নির্বাচনের ধরণবর্তমান আইনি স্থিতিসিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃপক্ষসম্ভাব্য সময়সীমা
সিটি কর্পোরেশন (মেয়র)অধ্যাদেশ সাপেক্ষে নির্দলীয় (অনিশ্চিত)জাতীয় সংসদসংসদ অধিবেশন পরবর্তী
সংরক্ষিত নারী আসনআনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিনির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলশপথের ৯০ দিনের মধ্যে
স্থানীয় কাউন্সিলর পদনির্দলীয় / উন্মুক্তবর্তমান বিধিমালা অনুযায়ীঘোষিত তফশিল অনুযায়ী

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একপক্ষ মনে করেন, দলীয় প্রতীকে ভোট হলে স্থানীয় উন্নয়নে কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাব পড়ে, যা অনেক সময় নিরপেক্ষতাকে বিঘ্নিত করে। অন্যদিকে, অন্যপক্ষের মতে দলীয় প্রতীক রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে।

যেহেতু ১২ মার্চ সংসদ অধিবেশন আহ্বানের সম্ভাবনা রয়েছে, তাই ধারণা করা হচ্ছে এই অধিবেশনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভবিষ্যৎ পদ্ধতি চূড়ান্ত হবে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে প্রশাসনিক সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে। সংসদের সবুজ সংকেত পাওয়া মাত্রই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করা হতে পারে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের তৃণমূল গুছিয়ে আনতে শুরু করেছে, যাতে যেকোনো পদ্ধতিতে নির্বাচন ঘোষণা হলে তারা শক্ত অবস্থানে থাকতে পারে।