সিংগাইরে শিশু নির্যাতন মামলার প্রধান আসামি মতি গ্রেপ্তার

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় পাঁচ বছরের এক শিশুকে পাশবিক নির্যাতনের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার প্রধান আসামি মতি বেপারীকে (৪৫) গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত মঙ্গলবার (৫ মে, ২০২৬) বিকেলে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার দেওঘাটা এলাকায় এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত মতি বেপারী সিংগাইর উপজেলার চান্দহর ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের মৃত সুবুর আলী বেপারীর ছেলে। তথ্যপ্রযুক্তির বিশেষ সহায়তা নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ তার অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।


ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পাশবিক নির্যাতনের বিবরণ

মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগী পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ছয় বছর আগে অভিযুক্ত মতি বেপারী এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে বিয়ে করেন। বিয়ের প্রায় ছয় মাস পর ওই নারী একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। মতি বেপারী শিশুটির সৎ বাবা হলেও পারিবারিক পরিবেশে তারা সিংগাইরের মাধবপুর গ্রামে একত্রে বসবাস করে আসছিলেন। গত ১ মে, ২০২৬ (শুক্রবার) দিবাগত রাতে এই লোমহর্ষক নির্যাতনের ঘটনাটি ঘটে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সেদিন রাত ১১টার দিকে মতি বেপারী তার স্ত্রী ও পাঁচ বছর বয়সী কন্যা শিশুটিকে নিয়ে নিজ কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, রাত আনুমানিক ২টার দিকে মতি বেপারী অত্যন্ত সুকৌশলে তার স্ত্রীকে কোনো এক ধরনের শক্তিশালী চেতনানাশক ঔষধ প্রয়োগ করে অচেতন করে ফেলেন। স্ত্রী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালান।

নির্যাতনের একপর্যায়ে শিশুটির আর্তচিৎকার ও তীব্র যন্ত্রণার শব্দে তার মায়ের ঘুম ভেঙে যায়। সজাগ হওয়ার পর তিনি দেখতে পান শিশুটি গুরুতর আহত অবস্থায় ব্যথায় কাতরাচ্ছে এবং পাশে অভিযুক্ত মতি বেপারী অবস্থান করছেন। ঘটনার আকস্মিকতায় মা আতঙ্কিত হয়ে পড়লে মতি বেপারী তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং ঘটনাটি কাউকে না জানানোর জন্য প্রাণনাশের হুমকি দেন। লোকলজ্জা ও পরিণতির ভয় দেখিয়ে রাতেই অভিযুক্ত ব্যক্তি বাড়ি থেকে পালিয়ে আত্মগোপন করেন।


চিকিৎসা ও মামলার আইনি অগ্রগতি

পরদিন অর্থাৎ শনিবার সকালে শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে তাকে স্থানীয় সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা শিশুটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন এবং জখমের গভীরতা বিবেচনা করে তাকে দ্রুত মানিকগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। চিকিৎসকদের মতে, শিশুটির ওপর হওয়া শারীরিক নির্যাতনের মাত্রা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। বর্তমানে শিশুটি জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগীর ডাক্তারি পরীক্ষার প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করেছে।

এদিকে ঘটনার তিন দিন পর, অর্থাৎ ৪ মে, ২০২৬ (সোমবার) ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে সিংগাইর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর- ১০/২০২৬। মামলার এজাহারে সৎ বাবা মতি বেপারীকে একমাত্র আসামি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। মামলা দায়েরের পরপরই সিংগাইর থানা পুলিশ এবং জেলা গোয়েন্দা পুলিশ আসামিকে আইনের আওতায় আনতে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে।


গোয়েন্দা পুলিশের অভিযান ও গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া

মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বর্বরোচিত হওয়ায় মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি চৌকস দল তদন্তে নামে। পলাতক আসামির সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবহার করা হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আসামি মানিকগঞ্জ জেলা সীমান্ত অতিক্রম করে পার্শ্ববর্তী টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর এলাকায় আত্মগোপন করে আছেন।

মঙ্গলবার বিকেলে ডিবি পুলিশের বিশেষ দলটি মির্জাপুরের দেওঘাটা এলাকায় অবস্থান নেয় এবং সুপরিকল্পিত অভিযানের মাধ্যমে মতি বেপারীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া ডিবি কর্মকর্তা জানান, আসামি বারবার তার অবস্থান ও মোবাইল সিম পরিবর্তন করে পুলিশের চোখ এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে তার শেষ রক্ষা হয়নি।


প্রশাসনিক বক্তব্য ও বিচার প্রক্রিয়া

সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া মেনে আসামিকে আদালতে সোপর্দ করার কাজ চলমান রয়েছে। পুলিশ এই মামলার নিরপেক্ষ ও নিখুঁত তদন্ত নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সকল বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ ও আলামত সংগ্রহ করছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের জঘন্য ও মানবিকতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিজ্ঞ আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করার মাধ্যমে আসামির দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট এলাকায় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এলাকাবাসী ভুক্তভোগী শিশুর যথাযথ সুচিকিৎসা এবং অপরাধীর ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সুরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদারকি করছে।

বিচারের দাবি জানিয়ে স্থানীয়রা বলেন, এ ধরনের ঘটনা সমাজের জন্য চরম লজ্জাজনক। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই মামলার নিষ্পত্তি হলে তা অপরাধীদের জন্য একটি কড়া বার্তা হিসেবে কাজ করবে।