বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় এক সালিশ বৈঠকে পুলিশের উপস্থিতিতেই নৃশংসভাবে এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রোববার (২২ মার্চ) বিকেলে উপজেলার চরহোগলা গ্রামে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন খোরশেদ সিকদার (৬৫), যিনি স্থানীয়ভাবে একজন প্রবীণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘর নির্মাণের পাওনা অর্থ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এ বিরোধ মীমাংসার লক্ষ্যে গ্রামে একটি সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। তবে আলোচনার একপর্যায়ে তর্ক-বিতর্ক থেকে উত্তেজনা বাড়তে থাকে এবং তা দ্রুত সহিংস রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কয়েকজন ব্যক্তি মিলে খোরশেদ সিকদারের ওপর নির্মম হামলা চালায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, লাঠি ও চেয়ার দিয়ে তাকে বেদম মারধর করা হচ্ছে, এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন পুলিশ সদস্য তা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও কার্যত ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে গুরুতর আহত অবস্থায় খোরশেদ সিকদার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাকে দ্রুত মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনার পরপরই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনার ভিত্তিতে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে মেহেন্দিগঞ্জ পৌর বিএনপির ১ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হাওলাদারকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ বিষয়ে এক বিজ্ঞপ্তিতে পৌর বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ রিয়াজ শাহিন লিটন এবং সদস্যসচিব রিয়াজ উদ্দিন চৌধুরী দিনু মিয়া স্বাক্ষর করেন।
মেহেন্দিগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বশির আহম্মেদ জানান, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও পরিস্থিতি তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। তিনি আরও বলেন, “ঘটনার পরপরই লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বরিশাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। দোষীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”
এ ঘটনায় আরও অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নিহতের পরিবার ইতোমধ্যে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে।
বরিশালের পুলিশ সুপার এ জেড এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল, তবে আকস্মিক সহিংসতার কারণে হতাহতের ঘটনা এড়ানো যায়নি। তিনি আশ্বাস দেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিম্নে ঘটনাটির সংক্ষিপ্ত তথ্য উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| ঘটনার স্থান | চরহোগলা গ্রাম, মেহেন্দিগঞ্জ |
| ঘটনার সময় | ২২ মার্চ, বিকেল |
| নিহতের নাম | খোরশেদ সিকদার (৬৫) |
| ঘটনার কারণ | অর্থসংক্রান্ত বিরোধ |
| আহতের সংখ্যা | অন্তত ৩ জন |
| অভিযুক্ত ব্যক্তি | জাহাঙ্গীর হাওলাদার |
| গৃহীত ব্যবস্থা | দল থেকে বহিষ্কার |
| তদন্ত অবস্থা | মামলা প্রক্রিয়াধীন, গ্রেপ্তার অভিযান চলছে |
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি গ্রামীণ সালিশ ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের সালিশে যথাযথ আইনি কাঠামো ও পর্যবেক্ষণ না থাকলে ভবিষ্যতেও এমন সহিংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
