মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইরান এই কৌশলগত জলপথে নৌ মাইন স্থাপন করেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ইসলামিক রেভলুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) অন্তত এক ডজন উন্নতমানের নৌ মাইন স্থাপন করেছে। ‘মাহাম-৩’ এবং ‘মাহাম-৭’ নামের এই মাইনগুলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, যা জাহাজ শনাক্ত করতে সক্ষম এবং নির্দিষ্ট দূরত্বে পৌঁছালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিস্ফোরিত হতে পারে। ফলে এগুলো শুধু প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র নয়, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রুট নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া দুই দিনের আলটিমেটামের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই—২৩ মার্চের মধ্যে—এই মাইনগুলো বসানো হয়। যদিও ঠিক কত সংখ্যক মাইন স্থাপন করা হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যায় কম হলেও এই মাইনগুলোর প্রভাব হতে পারে ব্যাপক।
হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব বোঝাতে নিচের তথ্যগুলো উল্লেখযোগ্য—
| বিষয় | পরিমাণ/তথ্য |
|---|---|
| বিশ্ব তেল পরিবহনের অংশ | প্রায় ২০% |
| দৈনিক তেল পরিবহন | প্রায় ২ কোটি ব্যারেল |
| গুরুত্বপূর্ণ রুট | পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজার |
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইনগুলো এলোমেলোভাবে স্থাপন করা হয়নি; বরং নির্দিষ্ট কৌশলগত স্থানে বসানো হয়েছে। এর ফলে ইরান চাইলে কিছু জাহাজ চলাচল করতে দিতে পারে, আবার প্রয়োজনে নির্দিষ্ট জাহাজ বা রুট বন্ধও করে দিতে পারে। অর্থাৎ, পুরো প্রণালী বন্ধ না করেও আংশিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে।
এছাড়া ধারণা করা হচ্ছে, ইরান নিজস্ব উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় নয়, বরং তুলনামূলক দূরের এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ অংশে এসব মাইন স্থাপন করেছে—বিশেষত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই উপকূল সংলগ্ন এলাকায়। এতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে সরাসরি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা আরও বেড়েছে।
নৌ-ইতিহাসবিদ জন বাল্কলির মতে, “বিশ্বের তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সরাসরি যুদ্ধের প্রয়োজন পড়ে না—এটাই আধুনিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা।” তার এই মন্তব্য পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করে।
যদিও এখন পর্যন্ত কোনো জাহাজ মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি, তবুও ঝুঁকির কারণে অনেক শিপিং কোম্পানি ইতোমধ্যে এই রুটে চলাচল কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বাস্তবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং বীমা খরচও বেড়ে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নিতে পারে বলে জানা গেছে। জাপানও প্রয়োজনে সহায়তা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। মার্কিন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জ্যাক কীন সতর্ক করে বলেছেন, “এ ধরনের পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি, কারণ প্রতিপক্ষের অতীত আচরণ বিশ্বাসযোগ্য নয়।”
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালী এখনো উন্মুক্ত থাকলেও এর নিরাপত্তা আগের মতো নেই। সামান্য একটি অঘটনও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।
