সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরী: এক আপসহীন কলমযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রয়াণ দিবস

বাঙালি সাংবাদিকতা এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম শাহাদত চৌধুরী। একজন দক্ষ সম্পাদক, শিল্পী ও অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দীর্ঘ ছয় দশকের কর্মময় জীবনে তিনি যে অনন্য অবদান রেখে গেছেন, তা আজও অম্লান। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশজুড়ে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে। ১৯৪৩ সালের ২৮ জুলাই খুলনায় জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তিত্ব কৈশোর থেকেই শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। ঢাকা ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস থেকে চিত্রশিল্পে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলেও সাংবাদিকতাই হয়ে ওঠে তাঁর আজীবনের ধ্যান-জ্ঞান।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শাহাদত চৌধুরীর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। তিনি দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এর একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে একাধিক দুঃসাহসিক অভিযানে অংশ নেন। ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার খালেদ মোশাররফের অধীনে ঢাকা ও এর আশেপাশে তিনি গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করেন। বিশেষ করে পুরান ঢাকার হাটখোলায় তাঁদের পৈতৃক বাড়িটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম গোপন আশ্রয়স্থল ও অস্ত্রাগার। যুদ্ধের সেই কঠিন সময়ে জীবন বাজি রেখে তিনি রণাঙ্গনের খবরাখবর এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখার কাজ করেছেন।

দেশ স্বাধীনের পর শাহাদত চৌধুরী পুনরায় তাঁর প্রিয় পেশা সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালে তিনি ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তী ২৫ বছর তাঁর সুযোগ্য সম্পাদনায় পত্রিকাটি সাফল্যের শিখরে পৌঁছায়। বিচিত্রা ছিল দেশের মধ্যবিত্ত সমাজের মননশীলতা, রাজনীতি ও সংস্কৃতির আসল দর্পণ। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশের গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী ও সাহসী সাংবাদিকতার নতুন ধারা প্রবর্তিত হয়। ১৯৯৭ সালে বিচিত্রা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি হাল ছাড়েননি; ১৯৯৮ সালে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ এবং পাক্ষিক ‘আনন্দধারা’। ২০০৫ সালের ২৯ নভেম্বর এই মহান সম্পাদকের জীবনাবসান ঘটে। আধুনিক সাংবাদিকতার রূপকার হিসেবে শাহাদত চৌধুরী আজও নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের কাছে এক আদর্শিক বাতিঘর।

জিলাইভ/টিএসএন