সংবিধান লঙ্ঘন: ড. ইউনূসের বিচার দাবি সাংবাদিক মাসুদ কামালের

সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল। তাঁর মতে, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করার দায়ে ড. ইউনূসসহ সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা উচিত। গত মঙ্গলবার নিজের ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেল ‘কথা’-তে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার

সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’-তে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের একটি দুই পর্বের বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সেখানে রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন প্রক্রিয়া এবং ওই সরকারের কার্যক্রম চলাকালীন বিভিন্ন সাংবিধানিক অসংগতির কথা অকপটে তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সাহসী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন মাসুদ কামাল। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রপতি স্পষ্টভাবেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধানের অনেক বিধিনিষেধ মান্য করেনি।

মাসুদ কামালের আইনি ও নৈতিক যুক্তি

ভিডিও বার্তায় মাসুদ কামাল বলেন, “দেশের সর্বোচ্চ আইন হচ্ছে সংবিধান। যদি কেউ সেই পবিত্র গ্রন্থ বা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখান এবং তার জন্য কোনো জবাবদিহিতা না থাকে, তবে তা ভবিষ্যতে অত্যন্ত মন্দ উদাহরণ হয়ে থাকবে। এতে করে অন্যরাও সংবিধানকে পদদলিত করার দুঃসাহস পাবে।”

তিনি আরও যোগ করেন যে, এই সরকার বারবার নিজেদের ‘সাংবিধানিক সরকার’ বলে দাবি করে এসেছে। এমনকি তারা রাষ্ট্রপতির কাছে সংবিধান রক্ষা ও সমুন্নত রাখার শপথও নিয়েছিলেন। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে তারা সেই শপথের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর মতে, গত ১৮ মাসের শাসনামলে যেখানেই সংবিধান লঙ্ঘন হয়েছে, তার প্রতিটি ঘটনার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

সাংবিধানিক অবস্থানের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

মাসুদ কামালের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সাংবিধানিক অবস্থান ও অভিযোগের ক্ষেত্রগুলো নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো:

বিষয়বস্তুসাংবিধানিক দাবি ও বাস্তবতামাসুদ কামালের পর্যবেক্ষণ
সরকারের ধরণসাংবিধানিক অন্তর্বর্তী সরকারসংবিধানের বিধান মেনে চলতে ব্যর্থ।
শপথ গ্রহণরাষ্ট্রপতির নিকট শপথ গ্রহণশপথ ভঙ্গ ও সংবিধান পদদলিত করার অভিযোগ।
রাষ্ট্রপতির ভূমিকানির্বাহী বিভাগের প্রধান পরামর্শকরাষ্ট্রপতির পরামর্শ বা সাংবিধানিক বিধান উপেক্ষা।
জবাবদিহিতাজনগণের নিকট দায়বদ্ধতাবিচারের আওতায় না আনলে আইনি অরাজকতা সৃষ্টি হবে।
মেয়াদকাল১৮ মাস (অন্তর্বর্তী সময়)দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইনি অসংগতির অভিযোগ।

বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান

মাসুদ কামাল তাঁর আলোচনায় একটি দেশের স্থিতিশীলতার জন্য আইনের শাসনের গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে নন, এমনকি তিনি যদি নোবেলজয়ী বা বিশ্ববরেণ্য কোনো ব্যক্তিত্বও হন। তিনি বলেন, “যদি আজ ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের মামলা না করা হয়, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। উপদেষ্টারা যেখানে যেখানে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই শাস্তি হওয়া উচিত।”

উপসংহার ও জনমত

সাংবাদিক মাসুদ কামালের এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সচেতন মহলের একাংশ মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ হওয়া জরুরি। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতির মতো পদাধিকারী ব্যক্তি যখন সরকারের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন, তখন সেটি আর সাধারণ রাজনৈতিক সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এখন দেখার বিষয়, পরবর্তী সরকার বা দেশের উচ্চ আদালত এই গুরুতর অভিযোগগুলোকে কীভাবে আমলে নেয়। সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এই ধরনের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি সুষ্ঠু সমাধান আসা একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিজ্ঞজনেরা।