শ্রীলঙ্কা গৃহযুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক হস্তক্ষেপ, গোপন নথি প্রকাশ

শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের প্রাথমিক সময়কালে ইসরায়েল দেশটিকে সামরিক সহায়তা এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সম্প্রতি ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত আর্কাইভে দেখা গেছে, ১৯৮৪ সালে কলম্বোয় একটি ‘ইন্টারেস্টস সেকশন’ স্থাপন করা হয়েছিল শ্রীলঙ্কার তামিল বিদ্রোহ দমন ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। ১৯৭০ সালে আরব দেশগুলোর চাপের কারণে শ্রীলঙ্কা ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল, কিন্তু দেশটির গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলের সঙ্গে গুপ্তভাবে যোগাযোগ চালানো হয়েছিল।

নথিপত্রে জানা যায়, শ্রীলঙ্কার সরকার ১৯৮৪ সালে ইসরায়েলকে আহ্বান জানিয়েছিল তাদের তামিল বিদ্রোহ দমন কার্যক্রমে সহায়তা করার জন্য। ১৯৮৮ সালের মধ্যে ইসরায়েল শ্রীলঙ্কাকে প্রায় ৩ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে।

ইসরায়েলের সামরিক সহায়তার বিস্তারিত

সালসামরিক সহায়তাপরিমাণ / বিবরণউদ্দেশ্য / মন্তব্য
১৯৮৫দ্রুতগামী টহল নৌকা৬টি ডভোরা-ক্লাস, ১ কোটি ডলারসামুদ্রিক সীমান্ত নিরাপত্তা বৃদ্ধি
১৯৮৬মিনি-উজি সাবমেশিন গানউল্লেখযোগ্য পরিমাণতামিল বিদ্রোহ দমন
১৯৮৭ইলেকট্রনিক ফেন্স, যোগাযোগ সরঞ্জাম, মেশিনগানবিভিন্ন সরঞ্জামসীমান্ত নিরাপত্তা ও নজরদারি
১৯৮৬প্রেসিডেন্টের দেহরক্ষীদের প্রশিক্ষণ৩০ জন, ৪ দিনের কোর্সব্যক্তিগত নিরাপত্তা উন্নয়ন
১৯৮৭সামরিক প্রশিক্ষণইসরায়েলি প্রশিক্ষকরা ‘কৃষি উপদেষ্টা’ ছদ্মবেশেস্থানীয় বাহিনীকে দ্রুত আক্রমণে সক্ষম করা
১৯৮৭স্পেশাল পুলিশ ও এসটিএফসীমিত, উচ্চ প্রশিক্ষণনিরাপত্তা ইউনিট শক্তিশালীকরণ

ইসরায়েলি প্রশিক্ষকরা জনসমক্ষে ‘কৃষি উপদেষ্টা’ পরিচয় ধারণ করলেও মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক দক্ষতা বৃদ্ধি। প্রশিক্ষণার্থীদের মূল ফোকাস ছিল জাফনা অঞ্চলের তামিল বিদ্রোহীদের মোকাবিলা এবং সীমান্ত রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর হওয়া। এছাড়া, প্রেসিডেন্ট জুনিয়াস রিচার্ড জয়াবর্ধনের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল।

নথিপত্রে দেখা যায়, ইসরায়েল মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি জানলেও সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখে। বিশেষ করে দক্ষিণের তামিলদের ওপর সেনা ও বিমান হামলা, গ্রেপ্তার এবং দমন কার্যক্রম চলার পরও ইসরায়েল সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছিল। এই নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের সামরিক সহায়তা শুধুমাত্র বিদ্রোহ দমন নয়, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে পরিচালিত হয়েছিল।

১৯৮৭ সালের একটি বার্তায় ইসরায়েলি কূটনীতিক ইলান পেলেগ লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট জয়াবর্ধনের নিরাপত্তা চাহিদা পূরণ করা এবং নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল। এছাড়া, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা নথিতে স্বীকার করেছেন যে, তারা স্পেশাল টাস্ক ফোর্সকে প্রশিক্ষণ দিতে অংশ নিয়েছিল, যাদের কার্যক্রম মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ঘেরা ছিল।

এই প্রকাশিত নথিপত্রের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, ১৯৮০-এর দশকে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে ইসরায়েলের অবদান ছিল গুপ্ত এবং কৌশলগত। সামরিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা সহায়তার মাধ্যমে ইসরায়েল শ্রীলঙ্কার সরকারকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সহায়তা করেছিল, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি জানলেও কূটনৈতিক স্বার্থের কারণে কার্যক্রম চালিয়ে গিয়েছিল।