“শুধু ভোট চায়, আলুর কথা বোঝে না।”

রংপুরের পীরগাছা–কাউনিয়া অঞ্চলের আলুচাষিরা এবারও বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি। মাসুম মিয়া নামের এক কৃষক গত বছর ১০ একর জমিতে আলু চাষ করে ১৮ লাখ টাকা লোকসান করেছেন। পরিবারে এই লোকসানের চাপ এতোটাই যে, ইতিমধ্যেই তিনটি গরু বিক্রি করতে হয়েছে। ভয়ে এ বছর তিনি আলু চাষ কমিয়ে দিয়েছেন; এবার চাষ করেছেন মাত্র ৩ একর ৪৮ শতাংশ জমিতে। যদি এবারও দাম না পান, কৃষক বলেন, পথে বসতে হবে।

গত বৃহস্পতিবার সকালে মাসুম মিয়া সহ পাঁচজন আলুচাষির সঙ্গে কথা হয় তালতলা বাজারে। বাজারটি রংপুর–সুন্দরগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের পাশে অবস্থিত। এই এলাকায় রংপুর–৪ আসনের জন্য মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এনসিপির আখতার হোসেন, বিএনপির মোহাম্মদ এমদাদুল হক এবং জাতীয় পার্টির আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমানের মধ্যে। কিন্তু স্থানীয় কৃষকেরা অভিযোগ করছেন, প্রার্থীরা শুধু ভোট চাইছেন, তাদের সমস্যার কথা শুনছেন না।

ছোট কল্যাণী, স্বচাষ, বড়দরগা, কালুক পষুয়া, বড় হাজরা ও নব্দিগঞ্জ গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠ আলু চাষ। এলাকার মানুষের ভাষ্য অনুযায়ী, ৯৫ শতাংশ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আলু চাষের সঙ্গে যুক্ত। ছোট কল্যাণী গ্রামের ছলিম উদ্দীন বলেন, “ওরা শুধু ভোটের দরকার, আমাদের দুঃখ কেউ শোনে না। আলুর লোকসান সামলাতে গিয়ে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।”

রংপুর জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার কৃষিজমি ১ লাখ ৮৯,৫১৪ হেক্টর, যার ২৮–২৯ শতাংশে আলু চাষ হয়। তবে এ বছর আলুর আবাদ কমেছে; গত বছরের ৬৬,২৮০ হেক্টর জমির তুলনায় এবার আবাদ হয়েছে মাত্র ৫৪,৫০০ হেক্টরে।

বছরআলু আবাদ (হেক্টর)হ্রাস (হেক্টর)
২০২৫66,280
২০২৬54,50011,780

আলু চাষের খরচ এবং উৎপাদন নিয়েও কৃষকদের অসন্তোষ রয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছর প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে গড় খরচ পড়েছে ১৭.৮০ টাকা, তবে কৃষকরা গড়ে ৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে পেরেছেন। ৬৫ কেজির বস্তায় হিমাগার ভাড়া ৩৮০ টাকা। আলুর দাম কমে গেলে অনেক কৃষক আলু হিমাগার থেকে তুলে গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছেন।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. হোসেন আলী গাজী বলেন, “আলু এই এলাকার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। মানুষ আলুর আবাদে ধনী হয়েছে, কিন্তু লোকসান এবং সংরক্ষণ সমস্যার কারণে এখন আগ্রহ কমছে।” স্থানীয় কৃষকরা মনে করেন, সরকার যদি বড় হিমাগার তৈরি করে এবং বীজ, সার ও কীটনাশকের দাম ও মান নিয়ন্ত্রণে রাখে, তবে চাষীদের পরিস্থিতি অনেক উন্নত হতে পারে।

যাইহোক, স্বচাষ গ্রামের সুমন কুমার শর্মা বলেছেন, “লোকসান হলেও আলু চাষ করতে হবে। কৃষি ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।” এ কথায় বোঝা যায়, রংপুরের কৃষকেরা সংগ্রাম ও আশা, দুয়ের মধ্যে জীবনের নিয়তি বাঁধাই করে রেখেছেন।