ঢাকার পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের প্রাণ হিসেবে পরিচিত শীতলক্ষ্যা নদীকে দূষণমুক্ত করতে এক ঐতিহাসিক ও কঠোর আদেশ দিয়েছেন দেশের উচ্চ আদালত। ইটিপি (Effluent Treatment Plant) বা বর্জ্য শোধনাগার ছাড়া পরিচালিত ২০টি শিল্প কারখানার বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ অবিলম্বে বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণে আদালতের এই অনমনীয় অবস্থান নদী রক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Table of Contents
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার প্রেক্ষাপট
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ২০২৬), বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি মোহাম্মদ আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে এই আদেশ প্রদান করেন। আদালতে রিটকারী সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ (এইচআরপিবি)-এর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরশেদ। তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট সঞ্জয় মন্ডল। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মুনতাসির উদ্দিন আহাম্মেদ এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ শফিকুর রহমান।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিল্প কারখানা কোনো প্রকার শোধনাগার ছাড়াই সরাসরি বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলছে। এর ফলে নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। গত বছরের ৬ মে হাইকোর্ট এই বিষয়ে একটি রুল জারি করেছিলেন এবং একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করে দূষণের মাত্রা ও ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন ও অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান
আদালতের আগের নির্দেশ অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তর গত ৮ ডিসেম্বর একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কারখানা ইটিপি ছাড়াই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর ধরে আইন অমান্য করে নদীর পানি বিষাক্ত করে তুলছিল। প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর এইচআরপিবির সম্পূরক আবেদনের ভিত্তিতে আদালত আজ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
সংযোগ বিচ্ছিন্নের তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য কারখানাসমূহ
পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠানের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাদের একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| ক্রমিক | প্রতিষ্ঠানের নাম | ধরন/প্রকৃতি | বর্তমান আইনি অবস্থা |
| ১ | খালেক টেক্সটাইল | টেক্সটাইল ও ডাইং | সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ |
| ২ | লীনা পেপার মিল | কাগজ উৎপাদন | সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ |
| ৩ | আর এস কে ডাইং | ফেব্রিক প্রসেসিং | সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ |
| ৪ | খান ব্রাদার্স টেক্সটাইল | টেক্সটাইল | সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ |
| ৫ | এসআরএস নিড ডাইং | নিটওয়্যার | সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ |
| ৬ | মেসার্স রুবেল ডাইং | ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং | সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ |
| ৭ | বাংলাদেশ ডাইং অ্যান্ড প্রসেসিং | প্রসেসিং ইউনিট | সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ |
| ৮ | এশিয়ান ফেব্রিক | টেক্সটাইল | সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ |
| ৯ | জিলানী ডাইং | ডাইং | সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ |
| ১০ | গাজীপুর বোর্ড মিলস | বোর্ড উৎপাদন | সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ |
উল্লেখ্য যে, তালিকায় আরও রয়েছে নিউ আলম ডাইং, মায়ের দোয়া ডাইং, এম আর ডাইং, আব্দুর রব ডাইং, বিসমিল্লাহ নিট ডাইং, শিমুল ডাইং, রাজ্জাক ওয়াশিং এবং হাজি রাসূল ডাইং সহ মোট ২০টি প্রতিষ্ঠান।
বাস্তবায়নের সময়সীমা ও পরবর্তী পদক্ষেপ
হাইকোর্ট তার আদেশে বিআইডব্লিউটিএ-এর চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নির্দেশ কার্যকর করার দায়িত্ব দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বয় করে এই ২০টি প্রতিষ্ঠানের ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে যাতে তারা আর দূষণ ছড়াতে না পারে।
আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছেন যে, এই আদেশ বাস্তবায়নের পর একটি পূর্ণাঙ্গ ‘কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট’ বা বাস্তবায়ন প্রতিবেদন আগামী ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে হবে। পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, এই আদেশের ফলে শিল্প মালিকদের মধ্যে একটি কড়া বার্তা পৌঁছাবে যে, পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে ব্যবসা পরিচালনা করার সুযোগ আর নেই। শীতলক্ষ্যার অস্তিত্ব রক্ষায় এটি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
