রাজধানীর কদমতলীতে সাত বছরের শিশু রিফাত হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তুচ্ছ মোবাইল চুরির অপবাদ ও পূর্ব শত্রুতার জের ধরে প্রতিবেশী এক নারী ঘাতক হয়ে রিফাতকে নির্মমভাবে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত বুধবার পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার একটি ময়লার স্তূপ থেকে ড্রামবন্দি অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘাতক প্রতিবেশী মায়া বেগম ওরফে লাবণীকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নির্মম হত্যাকাণ্ড
নিহত রিফাতের বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন পেশায় একজন অটোরিকশাচালক। তারা কদমতলীর খানকাহ শরিফ এলাকায় বসবাস করেন। পুলিশি তদন্ত ও অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার রিফাত খেলাধুলা করতে বাইরে বের হলে প্রতিবেশী মায়া বেগম তাকে খাবারের লোভ দেখিয়ে নিজের বাসায় ডেকে নেন। কয়েক মাস আগে মায়া বেগমের একটি মোবাইল ফোন চুরি হয়েছিল, যার জন্য তিনি রিফাতের বোনকে সন্দেহ করতেন। এই নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ও তিক্ততা ছিল।
বাসায় নিয়ে রিফাতকে সেই মোবাইল চুরির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন মায়া। শিশুটির উত্তরে সন্তুষ্ট হতে না পেরে তিনি প্রচণ্ড ক্ষোভে তাকে সজোরে থাপ্পড় মারেন। থাপ্পড়ের আঘাতে শিশুটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাটের কোণায় সজোরে আঘাত পায় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
মরদেহ গুমের পৈশাচিক প্রচেষ্টা
হত্যাকাণ্ডের পর আতঙ্কিত মায়া বেগম ঘটনা ধামাচাপা দিতে পৈশাচিক এক পরিকল্পনা করেন। তিনি বাসায় থাকা একটি প্লাস্টিকের চালের ড্রামে রিফাতের নিথর দেহটি ভরে ফেলেন। সারা রাত সেই লাশের ড্রাম পাহারা দিয়ে পরদিন বুধবার সকালে তিনি অটোরিকশা যোগে গেন্ডারিয়ার লোহারপুল এলাকায় যান। সেখানে লোকচক্ষুর আড়ালে একটি ময়লার ভাগাড়ে ড্রামটি ফেলে দিয়ে স্বাভাবিকভাবে বাসায় ফিরে আসেন।
নিচে ঘটনার ধারাবাহিকতা ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের একটি সারণি দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| নিহত শিশু | রিফাত (৭ বছর) |
| প্রধান অভিযুক্ত | মায়া বেগম ওরফে লাবণী (স্কুলের দপ্তরি) |
| হত্যাকাণ্ডের স্থান | কদমতলী খানকাহ শরিফ এলাকা |
| লাশ উদ্ধারের স্থান | গেন্ডারিয়ার লোহারপুল (ময়লার স্তূপ) |
| হত্যাকাণ্ডের কারণ | মোবাইল চুরির সন্দেহ ও পূর্ব বিরোধ |
| তদন্তের সূত্র | ড্রামে পাওয়া একটি কামিজ ও সিসিটিভি ফুটেজ |
যেভাবে শনাক্ত হলো অপরাধী
কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ আশরাফুজ্জামান জানান, মঙ্গলবার রিফাত নিখোঁজ হওয়ার পর তার মা মুন্নি আক্তার থানায় জিডি করেন। বুধবার রাতে গেন্ডারিয়া থেকে ড্রামবন্দি লাশ উদ্ধারের পর পোশাক দেখে পরিবার রিফাতকে শনাক্ত করে। তবে খুনিকে ধরার প্রধান সূত্র ছিল ড্রামের ভেতর পাওয়া একটি কামিজ।
পুলিশ তদন্ত চলাকালে রিফাতের বোনকে কামিজটি দেখালে সে জানায়, এমন পোশাক তাদের প্রতিবেশী মায়া বেগমের মেয়ের। পুলিশ তাৎক্ষণিক ওই বাসায় গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মেয়েটি প্রথমে পোশাকটি নিজের বলে স্বীকার করলেও পরে তা দেখাতে ব্যর্থ হয়। এতে পুলিশের সন্দেহ ঘনীভূত হয় এবং মায়া বেগমকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত স্বীকার করেন।
বিচার ও বর্তমান পরিস্থিতি
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মায়া বেগমকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে পাঠানো হয়েছে। একজন সামান্য দপ্তরি হয়েও প্রতিবেশীর অবুঝ শিশুকে এভাবে হত্যা এবং লাশ ড্রামে ভরে গুম করার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতের পরিবার এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
