নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অবকাঠামো সীমিত ছিল। দেশের হাতে গোনা কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের চাহিদা মেটাতে সক্ষম ছিল না। ফলে, তখনকার উচ্চশিক্ষাপ্রত্যাশীরা বড়সংখ্যায় প্রতিবেশী ভারত ও ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে নিজ অর্থায়নে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য যেত। এর ফলে দেশীয় মেধার ক্ষয় ও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ক্ষয় হতো। এই সমস্যা সমাধানে ১৯৯২ সালে প্রণীত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন দেশীয় শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে।
বর্তমানে দেশে মোট ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশই শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, ল্যাব ও লাইব্রেরির অভাব, নিজস্ব ক্যাম্পাসের অনুপস্থিতি এবং আধুনিক কারিকুলামের অভাব শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ট্রাস্টি বোর্ড। শিক্ষক নিয়োগ, সিলেবাস নির্ধারণ ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সব দায়িত্ব বোর্ডের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ডে দ্বন্দ্ব ও আর্থিক কেলেঙ্কারি শিক্ষার পরিবেশে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ও বাস্তব খরচ
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর টিউশন ফি সরকারি নিয়মের বাইরে গিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা বনানীর একটি মধ্যমসারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে পড়া আব্বাসকে প্রতি সেমিস্টারে ৫৬ হাজার টাকা টিউশন ফি দিতে হয়। ৬ মাসের সেমিস্টারের মোট খরচ (টিউশন, বাসা, থাকা-খাওয়া) প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা, অর্থাৎ বছরে প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
একইভাবে, রাজধানীর একটি প্রথমসারির বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিকস বিভাগের শিক্ষার্থী প্রতি সেমিস্টারে ৭০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় করছেন। বছরের তিনটি সেমিস্টার মিলিয়ে তার মোট শিক্ষাব্যয় দাঁড়ায় ২ লাখ ১০ হাজার টাকা, এবং থাকার খরচ সহ বছরে সাড়ে ৩ লাখ টাকা হয়।
নিম্নলিখিত টেবিলে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের আনুমানিক খরচ তুলে ধরা হলো:
| বিশ্ববিদ্যালয় | বিভাগ | সেমিস্টারপ্রতি টিউশন (টাকা) | সেমিস্টারপ্রতি মোট খরচ (টাকা) | বার্ষিক মোট খরচ (টাকা) |
|---|---|---|---|---|
| মধ্যমসারি বেসরকারি | ফার্মেসি | ৫৬,০০০ | ১,২৮,০০০ | ২,৫৬,০০০ |
| প্রথমসারি বেসরকারি | ইকোনমিকস | ৭০,০০০ | ১,৭৫,০০০ | ৩,১৫,০০০ |
| অন্যান্য | প্রকৌশল/বিজ্ঞান | ৪০,০০০–৬০,০০০ | ৯০,০০০–১২০,০০০ | ১,৮০,০০০–২,৪০,০০০ |
মূল সমস্যা
শিক্ষার মানহীনতা – অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, ল্যাব ও লাইব্রেরি নেই, ফলে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
উচ্চ টিউশন ফি – দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক ফি নেওয়া হচ্ছে।
লাভমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তর – শিক্ষার মান উন্নয়নের পরিবর্তে শিক্ষার্থীর পকেট কেটে লাভের ওপর নির্ভর।
১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন এবং ২০১০ সালের সংশোধনী অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর টিউশন ফি, অর্থায়নের উৎস ও সাধারণ তহবিলের নিয়ম রয়েছে। তবে বাস্তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইন অমান্য করে নিজেদের খেয়ালমাফিক ফি নির্ধারণ করছে।
এভাবে, শিক্ষার মানবিহীনতা ও টিউশন ফি লাগামছাড়া থাকা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি তদারকি ও যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়া দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্র একটি “উচ্চমূল্যের শিক্ষাবাণিজ্য” রূপে পরিণত হবে।
