শব্দসাধনায় ষাটে আনিসুল হক

সমকালীন বাংলা সাহিত্যে বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার এক উজ্জ্বল নাম আনিসুল হক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গদ্যকার্টুন, নাটক ও সাংবাদিকতা—প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর স্বতন্ত্র উপস্থিতি তাঁকে দিয়েছে আলাদা মর্যাদা। শব্দের প্রতি দায়বদ্ধতা, ইতিহাসচেতনা এবং মানবিক বোধের গভীরতা তাঁর রচনাকে দিয়েছে স্থায়িত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা। আজ ৪ মার্চ তাঁর ৬০তম জন্মদিন—এই দিনে ১৯৬৫ সালে নীলফামারীতে তাঁর জন্ম। উত্তর বাংলার প্রকৃতি, মানুষ ও জীবনসংগ্রাম তাঁর শৈশব-কৈশোরকে যেভাবে গড়ে তুলেছে, তার প্রতিফলন বারবার ফুটে উঠেছে তাঁর লেখায়।

শিক্ষা ও পেশাজীবনের সূচনা

রংপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৮১ সালে এসএসসি এবং রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান লাভ করে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রকৌশলী হিসেবে সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ থাকলেও তাঁর মন টেনেছে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগৎ।

১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে উত্তীর্ণ হয়ে রেলওয়ে বিভাগে যোগ দেন। তবে প্রশাসনিক চাকরির কাঠামোবদ্ধ জীবন তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। সৃজনী তাড়নায় তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই সাংবাদিকতায় যুক্ত হন।

সাংবাদিকতা জীবন

১৯৮৭ সালে সাপ্তাহিক ‘দেশবন্ধু’ পত্রিকার সহসম্পাদক হিসেবে তাঁর সাংবাদিকতা জীবন শুরু। পরবর্তী সময়ে ‘পূর্বাভাস’, ‘সাপ্তাহিক খবরের কাগজ’ এবং ‘দৈনিক ভোরের কাগজ’-এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি দৈনিক ‘প্রথম আলো’-এর সঙ্গে যুক্ত। সেখানে তাঁর কলাম, রম্যগদ্য ও গদ্যকার্টুন পাঠকমহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সমসাময়িক রাজনৈতিক-সামাজিক বিষয় নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণী ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে আলাদা করেছে।

সাহিত্যকর্ম: মুক্তিযুদ্ধ ও মানবতার ভাষ্য

বুয়েটে অধ্যয়নকালে কবিতায় ঝোঁক থাকলেও পরবর্তীতে কথাসাহিত্যেই তিনি স্থায়ী আসন গড়েন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘মা’ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। শহীদ আজাদ ও তাঁর মায়ের বাস্তব কাহিনি অবলম্বনে রচিত এই গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যে আবেগঘন ও ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত। বইটি একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হলো—

বিভাগউল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
উপন্যাসমা, বীর প্রতীকের খোঁজে, নিধুয়া পাথার, খেয়া, আমার মাকে কখনো
গল্পগ্রন্থ৫১বর্তী, আজকালকার ভালোবাসা, আলো-অন্ধকারে যাই, আমার একটা দুঃখ আছে, আয়েশা মঙ্গল
নাটকনাল পিরান, করিমন বেওয়া, প্রত্যাবর্তন, সাঁকো, প্রতি চুনিয়া, চড়ুইভাতি

২০২৩ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত ‘আমার মাকে কখনো’ উপন্যাসটি নতুন প্রজন্মের পাঠকের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

নাটক ও চলচ্চিত্রে অবদান

টেলিভিশন নাট্যরচনায়ও তিনি সমান সফল। তাঁর রচিত নাটকগুলো সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম দিক তুলে ধরেছে। চলচ্চিত্রের কাহিনিকার হিসেবেও তিনি পরিচিত। ‘Bachelor’ ও ‘Made in Bangladesh’ চলচ্চিত্রের কাহিনি রচনার মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

শ্রেষ্ঠ টিভি নাট্যকার পুরস্কার, টেনাশিনাস পদক, খুলনা রাইটার্স ক্লাব পদক এবং কবি মোজাম্মেল হক ফাউন্ডেশন পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। ২০১২ সালে কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ তাঁর সাহিত্যজীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

আনিসুল হক কেবল একজন লেখক নন; তিনি সময়ের ভাষ্যকার। ইতিহাসের অন্তর্লীন বেদনা, মানুষের স্বপ্ন ও সংগ্রামকে শব্দে ধারণ করাই তাঁর প্রধান শক্তি। ষাট বছরে পদার্পণের এই দিনে তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ সৃজনযাত্রা কামনা করা আমাদের সাহিত্যপ্রেমী সমাজের আন্তরিক প্রত্যাশা।