শতবর্ষী হাটে কবুতরের জমজমাট বাণিজ্য

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কীর্তিনাশা নদীর তীরে অবস্থিত ভোজেশ্বর হাট শুধু একটি সাধারণ গ্রামীণ বাজার নয়, বরং এটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা একটি ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যকেন্দ্র। বিশেষ করে কবুতর বেচাকেনার জন্য এই হাট দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সুপরিচিত। প্রতি সপ্তাহে শুক্র ও সোমবার বসা এই হাটে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার কবুতর বিক্রি হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় জমিদারদের উদ্যোগে এই হাটের গোড়াপত্তন হয়। নদীপথে সহজ যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দ্রুতই এটি শরীয়তপুর ও মাদারীপুর অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। বর্তমানে সড়ক ও নৌ—উভয় পথেই যোগাযোগ সুবিধাজনক হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা এখানে সমবেত হন।

ভোজেশ্বর হাটে দেশি জাতের কবুতরের পাশাপাশি গিরিবাজ, সিরাজী, রেসিং, হোমার, টিপলার এবং ময়ূরপঙ্খি জাতের কবুতর পাওয়া যায়। জাত ও গুণগত মান অনুযায়ী এসব কবুতরের দাম নির্ধারিত হয়। সাধারণত প্রতি জোড়া কবুতরের দাম ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

নিচে হাটে বিক্রি হওয়া কবুতরের ধরন ও মূল্যসীমার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—

কবুতরের ধরনবৈশিষ্ট্যমূল্য (প্রতি জোড়া)
দেশিসহজলভ্য, পালন সহজ৫০০–১,৫০০ টাকা
গিরিবাজআকাশে উড়ার দক্ষতা বেশি১,৫০০–৩,০০০ টাকা
সিরাজীআকর্ষণীয় গঠন ও রঙ২,০০০–৪,০০০ টাকা
রেসিং/হোমারদীর্ঘ দূরত্বে উড়তে সক্ষম৩,০০০–৫,০০০ টাকা
টিপলারদীর্ঘ সময় আকাশে ভাসতে পারে২,৫০০–৪,৫০০ টাকা
ময়ূরপঙ্খিনান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য জনপ্রিয়৩,০০০–৫,০০০ টাকা

হাটটি শুধু বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই নয়, বরং মানুষের জীবিকা ও স্বপ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ভোজেশ্বর বাজারের ইজারাদার নিক্সন খান আমাদের প্রতিনিধিকে জানান, কৃষিপণ্য, মাছ, গবাদিপশু ও দৈনন্দিন পণ্যের পাশাপাশি কবুতরের হাটটিই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ সৃষ্টি করে। সপ্তাহে দুই দিন বসা এই হাটে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখে।

শরীয়তপুর সদরের বাসিন্দা ৬৮ বছর বয়সী আবদুল মোতালেব প্রায় ৪০ বছর ধরে এই হাটে কবুতর বেচাকেনা করছেন। তিনি আমাদের প্রতিনিধিকে বলেন, এই হাটের সঙ্গে তাঁর জীবনের দীর্ঘ স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এই ব্যবসা থেকেই তিনি সংসার চালিয়েছেন এবং সন্তানদের শিক্ষিত করেছেন।

শুধু প্রবীণ ব্যবসায়ীরাই নন, তরুণ প্রজন্মও এই হাটকে ঘিরে গড়ে তুলছে নতুন সম্ভাবনা। অনেক শিক্ষার্থী এখানে থেকে কবুতর সংগ্রহ করে খামার তৈরি করছেন। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের পড়াশোনার খরচ বহন করছেন।

নড়িয়ার দিনারা এলাকার বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রওশন মাহমুদ এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি আমাদের প্রতিনিধিকে জানান, ছোটবেলা থেকেই এই হাটের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। বর্তমানে নিজের খামার থেকে কবুতর এনে হাটে বিক্রি করেন এবং নতুন কবুতর সংগ্রহ করেন। এই আয় দিয়েই তিনি পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি সঞ্চয়ও করছেন।

এ ছাড়া হাটের পাশে কবুতরের খাদ্য, ওষুধ, খাঁচা ও খামারসামগ্রীর দোকানও গড়ে উঠেছে, যা প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। খাদ্য বিক্রেতা সেলিম হাওলাদার জানান, অনেকেই হাটের দিনে আসতে না পারলেও এসব দোকান থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করেন।

সব মিলিয়ে ভোজেশ্বর হাট শুধু একটি বাজার নয়, এটি একটি ঐতিহ্য, জীবিকা এবং সম্ভাবনার এক অনন্য মিলনস্থল।