শতবর্ষী বাদামতলী ফলের বাজারে দৈনিক শতকোটি টাকার কারবার

রাজধানীর প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ফলের আড়ত বাদামতলী এখন উৎসবমুখর। রমজান মাসের পবিত্রতা আর ইফতারের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এই বাজারে শুরু হয়েছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। ১৯৩৫ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই বাজারটি বর্তমানে দেশের ফলের চাহিদার প্রধান চালিকাশক্তি। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) সরেজমিনে দেখা যায়, সদরঘাট থেকে আহসান মঞ্জিল পর্যন্ত পুরো এলাকাটি এখন ফলের ট্রাকে সয়লাব। বুড়িগঙ্গার তীরের এই আড়তগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার ফল দেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছে যাচ্ছে।

রমজানে খেজুরের আধিপত্য

রমজান মাসে ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো খেজুর। সারা বছর যে পরিমাণ খেজুর বিক্রি হয়, তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি চাহিদা থাকে এই এক মাসে। বিশ্বের প্রায় ৪৬টি দেশ থেকে আমদানিকৃত নানা জাতের খেজুর এখন বাদামতলীর গদিতে সাজানো। ব্যবসায়ীরা জানান, মান, আকার এবং আমদানির উৎসের ওপর ভিত্তি করে দামের ভিন্নতা দেখা যায়। বিশেষ করে মেডজুল, আজওয়া ও মরিয়ম খেজুরের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। তবে গত বছরের তুলনায় এবার জিহাদি খেজুরের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

বাদামতলী বাজারে বিভিন্ন ফলের পাইকারি দরদাম

নিচে বাদামতলী বাজারের প্রধান প্রধান খেজুর ও ফলের বর্তমান বাজারদরের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

ফলের নামওজন/পরিমাণবর্তমান দাম (টাকা)গত বছরের দাম (টাকা)
মেডজুল (প্রিমিয়ার)৫ কেজি৭,০০০৫,০০০-৬,০০০
আজওয়া৫ কেজি৩,০০০ – ৫,০০০২,৫০০ – ৪,০০০
মরিয়ম৫ কেজি৪,০০০ – ৫,০০০৩,৫০০ – ৪,৫০০
জিহাদি খেজুর১০ কেজি২,৭০০১,৭০০
দাবাস১০ কেজি৪,০০০ – ৫,০০০৩,০০০ – ৩,৫০০
সুক্কারি৩ কেজি১,৮০০ – ২,৪০০১,৫০০ – ২,০০০
তরমুজপ্রতি কেজি১০০ – ১২০৬০ – ৮০
স্ট্রবেরিপ্রতি কেজি৬০০ – ৭০০৫০০ – ৬০০

সরবরাহ ব্যবস্থা ও রাজস্ব সম্ভাবনা

পুরান ঢাকার এই পাইকারি বাজারে প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে তিনশ ট্রাক ও কনটেইনার ভর্তি ফল আসে। আমদানিকৃত ফলের প্রায় ৭০ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসে এবং বাকি ৩০ শতাংশ ভারত থেকে স্থলপথ (সাতক্ষীরা, হিলি, বুড়িমারী) দিয়ে প্রবেশ করে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৩৭ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হাজী মোহাম্মদ ফরহাদ রানা জানান, এই বাজার থেকে সরকার প্রতি বছর শতকোটি টাকা রাজস্ব পেলেও এলাকাটি তীব্র যানজটে জর্জরিত। বাজারটিকে আধুনিক ও ব্যবসায়ী বান্ধব করা গেলে রাজস্ব আরও কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।

মান নিয়ন্ত্রণ ও বিপণন বিধিমালা

ভোক্তা অধিকার রক্ষায় বাদামতলী ফল ব্যবসায়ী সমিতি এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সমিতির সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, বাজারে মান বজায় রাখতে কিছু কঠোর নিয়ম চালু করা হয়েছে:

  • মেঝেতে সরাসরি খেজুর রাখা নিষিদ্ধ; কাঠ বা চ্যাটাই ব্যবহার বাধ্যতামূলক।

  • মূল্য তালিকা প্রদর্শন এবং বিক্রির মেমো সংরক্ষণ করতে হবে।

  • মেয়াদোত্তীর্ণ বা পচা ফল বিক্রি করলে সদস্যপদ বাতিলসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাজার পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা

যদিও পাইকারি বাজারে কেনাবেচা তুঙ্গে, তবুও সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে দাম নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ দেখা গেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা পাইকার নয়ন মিয়া জানান, দেশি ফল যেমন—পেঁপে, পেয়ারা ও কুলের দামও এবার চড়া। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন সরকার যদি দ্রুত আমদানিকৃত ফলের শুল্ক ও বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ না করে, তবে মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাবে ইফতারের এই প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গগুলো।