ইরানের প্রভাবশালী নিরাপত্তা ব্যক্তিত্ব আলী লারিজানির নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গনে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) রাতে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। সরকারি ও আধা-সরকারি সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী তেহরানে একটি লক্ষ্যভেদী বিমান হামলায় তিনি নিহত হন, যা ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে একই দিন সকালে ইসরায়েল দাবি করে, তাদের পরিচালিত একটি নির্দিষ্ট সামরিক অভিযানে লারিজানিকে “নির্মূল” করা হয়েছে। এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরবর্তীতে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ জানায়, দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় লারিজানি ‘শাহাদাত’ বরণ করেছেন—যা দেশটির সরকারি ভাষ্যে তাকে জাতীয় বীরের মর্যাদায় উন্নীত করে।
এই হামলায় শুধু লারিজানিই নন, তার ঘনিষ্ঠজনরাও নিহত হয়েছেন। তার ছেলে মোর্তজা লারিজানি, কার্যালয়ের প্রধান আলিরেজা বায়াত এবং একাধিক দেহরক্ষী ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। ফলে ঘটনাটি ব্যক্তিগত ক্ষতির গণ্ডি ছাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আলী লারিজানি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের কৌশলগত নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে পরমাণু কর্মসূচি, প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে তার প্রভাব ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। তিনি ইরানের পার্লামেন্টের সাবেক স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর লারিজানিই কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, তার মৃত্যু ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্যে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই হত্যাকাণ্ড ইরান-ইসরায়েল সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলবে এবং আঞ্চলিক সংঘাতের মাত্রা বাড়াতে পারে।
একই দিনে পৃথক আরেকটি হামলায় ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী ‘বাসিজ’-এর প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানিও নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ফলে একই দিনে দুই শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার মৃত্যু ইরানের জন্য বিরল ও গুরুতর আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নিম্নে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নিহত ব্যক্তি | আলী লারিজানি |
| পদবী | সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি |
| ঘটনার তারিখ | ১৭ মার্চ |
| স্থান | তেহরান, ইরান |
| হামলার ধরন | লক্ষ্যভেদী বিমান হামলা |
| অন্যান্য নিহত | মোর্তজা লারিজানি, আলিরেজা বায়াত ও দেহরক্ষীরা |
| পৃথক ঘটনায় নিহত | গোলামরেজা সোলেইমানি (বাসিজ প্রধান) |
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ঘটনাকে “সন্ত্রাসী শাসনের বিরুদ্ধে বড় বিজয়” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে ইরান এই হামলাকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে পাল্টা পদক্ষেপের সম্ভাবনাকে উস্কে দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, আলী লারিজানির মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক ক্ষতি নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
