রেহানার অম্লান স্মৃতি

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ব্যক্তিগত ত্যাগ ও বীরত্বের গল্পগুলো চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। খুলনার সেনহাটি গ্রামের আবদুস সালাম খান এবং তার পরিবারও সেই ইতিহাসের অংশ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সালাম খান পাকিস্তান শাসনের বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন। অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তিনি গ্রামে তরুণদেরকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ দিতেন।

তবে এই ন্যায্য সংগ্রামের মূল্য তার পরিবারকেও দিতে হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল, পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যোগসাজশকারী দালালরা সালাম খানের বাড়িতে আক্রমণ চালায়। সালাম খান তখন গ্রামের বাইরে ছিলেন। সেই আক্রমণে চার মাস বয়সী তার কন্যা রেহানাকে বাড়ির উঠানে হত্যার শিকার করা হয়।

রেহানার ছবি না থাকায়, তার বাবা আবদুস সালাম খান ছোট মেয়ের জামাটি কাচের ফ্রেমে বাঁধেন। জামাটি ছিল ফিকে হলুদ রঙের সুতি কাপড়ের, বুকের খয়েরি ফালি ছাড়া অন্য কোনো নকশা ছিল না। সালাম খান মেয়ের রক্তমাখা মরদেহ রাতের অন্ধকারে পরিচ্ছন্ন করে রূপসা নদীতে ভাসিয়ে দেন এবং নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যান। স্বাধীনতার পরও তিনি মেয়ের স্মৃতির জন্য এই জামাটি যত্নসহকারে রক্ষা করেন।

১৯৯৬ সালে খুলনায় এক সুধী সমাবেশে আবদুস সালাম খান নিজ হাতে জামাটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টিদের হাতে তুলে দেন। জাদুঘরের একজন বিশেষজ্ঞ ডা. সারওয়ার আলী উল্লেখ করেন, “এই জামা দেখিয়ে বোঝা যায় যে মুক্তিযুদ্ধের সময় শিশুদেরও গণহত্যার শিকার হতে হয়েছে।” আবদুস সালাম খান ২০০৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

রেহানার জামা বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ২ নম্বর গ্যালারিতে স্থায়ীভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি শিশুর পোশাক নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যক্তিগত ত্যাগ এবং নির্দোষ প্রাণহানির প্রতীক।

নিচের টেবিলে বিষয়টি সংক্ষেপে দেখানো হলো:

তথ্যসূচকবিবরণ
নিহত শিশুর নামরেহানা
বয়সচার মাস
বাবাআবদুস সালাম খান
আক্রমণের তারিখ৩০ এপ্রিল ১৯৭১
আক্রমণের স্থানসেনহাটি, খুলনা
জামার বর্ণনাফিকে হলুদ সুতি, বুকের খয়েরি ফালি ছাড়া কোনো নকশা নেই
জামার সংরক্ষণকাচের ফ্রেমে রক্ষা করা হয়েছে
জাদুঘরে প্রদর্শনমুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ২ নম্বর গ্যালারি
মৃত্যু বা মৃত্যু-পরিস্থিতিরেহানা বাড়ির উঠানে হত্যা, বাবা মরদেহ নদীতে ভাসান
বাবা সালাম খানের মৃত্যু২০০৭

রেহানার জামা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মুক্তিযুদ্ধ শুধু বীর সৈনিকদের সংগ্রাম নয়, এটি নিরপরাধ শিশু ও সাধারণ মানুষদের উপর অমানবিক নির্যাতনের কথাও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। এই জামা সেই দুঃখের স্মৃতি ও সংগ্রামের শক্তিশালী প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।