ঢাকার প্রধান রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় ভয়ভীতি দেখিয়ে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘বিকাশ’-এর মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া একটি সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্রের এক সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ। রবিবার (১২ এপ্রিল) বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তাকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম মো. আতাউর রহমান ওরফে মেরাজুল (২৭)। তিনি ময়মনসিংহ জেলার ধোবাউড়া উপজেলার উত্তর ডোমঘাটা গ্রামের বাসিন্দা।
ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন রেলস্টেশনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র যাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল। এর মধ্যে আতাউর রহমান ছিল অন্যতম সক্রিয় সদস্য, যিনি মূলত ঢাকা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম এলাকাকে টার্গেট করতেন।
Table of Contents
যেভাবে চলত প্রতারণার কৌশল
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে প্রতারণা চালাত। প্রথমে তারা রেলস্টেশনে থাকা যাত্রীদের, বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও সহজ-সরল ব্যক্তিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলত। এরপর কৌশলে তাদের কাছ থেকে পরিবারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা হতো।
পরবর্তীতে সেই নম্বরে ফোন করে ভয়াবহ মিথ্যা তথ্য দেওয়া হতো। ফোনে বলা হতো—ভুক্তভোগীর কোনো স্বজন সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য জরুরি অর্থ প্রয়োজন। এই ধরনের তথ্য দিয়ে পরিবারে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হতো। চাপ ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত ‘বিকাশ’ নম্বরে টাকা পাঠাতে বাধ্য করা হতো ভুক্তভোগীদের।
একটি ঘটনার বিস্তারিত
পুলিশ নিশ্চিত করেছে, এ চক্রের মাধ্যমে ময়মনসিংহ জেলার পাগলা থানার এক কিশোরের পরিবার থেকে ১৩ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনার পর সন্দেহ হলে পরিবারটি খোঁজ নিয়ে বুঝতে পারে এটি একটি প্রতারণা, এরপর তারা অভিযোগ দায়ের করে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে রেলওয়ে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তির স্বীকারোক্তি
জিজ্ঞাসাবাদে মো. আতাউর রহমান স্বীকার করেছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এতে তিনি ঋণের চাপে পড়ে যান। আর্থিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই তিনি বাড়ি ছেড়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন রেলস্টেশন এলাকায় অবস্থান শুরু করেন এবং পরে এই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন।
প্রতারণার ধরন ও চক্রের কার্যপদ্ধতি
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| প্রতারণার ধরন | ফোনকলের মাধ্যমে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় |
| লক্ষ্যবস্তু | অপ্রাপ্তবয়স্ক ও সহজ-সরল যাত্রী ও পরিবার |
| ব্যবহৃত মাধ্যম | বিকাশসহ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস |
| কার্যস্থল | ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন ও আশপাশের এলাকা |
| প্রাপ্ত অর্থ | বিভিন্ন ঘটনায় ছোট অঙ্কের টাকা (এক ঘটনায় ১৩,০০০ টাকা) |
| প্রেরণা | অনলাইন জুয়ার আসক্তি ও ঋণগ্রস্ততা |
পুলিশের অবস্থান ও চলমান অভিযান
ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, রেলস্টেশন এলাকায় এ ধরনের প্রতারণা রোধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি নজরদারি করা হচ্ছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশ সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, কোনো অচেনা নম্বর থেকে দুর্ঘটনা, চিকিৎসা জরুরি বা আত্মীয় সংকটে পড়েছেন—এমন কথা বলে টাকা চাওয়া হলে তা যাচাই না করে কখনোই পাঠানো উচিত নয়। প্রয়োজনে দ্রুত রেলওয়ে পুলিশ বা নিকটস্থ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সামাজিক ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রতারণা অপরাধীরা মানুষের আবেগ, ভয় ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে সংঘটিত করে। মোবাইল আর্থিক সেবার দ্রুত বিস্তার যত বেড়েছে, ততই এই ধরনের ডিজিটাল প্রতারণার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তারা মনে করেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়, সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং ডিজিটাল লেনদেনে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, রেলস্টেশনভিত্তিক এই ভয়ভীতি নির্ভর প্রতারণা চক্রের এক সদস্য গ্রেপ্তার হলেও এর পেছনে থাকা নেটওয়ার্ক ও পুরো চক্র শনাক্ত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
