রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সূচি পিছিয়ে যাওয়ায় ব্যয়, ঋণের চাপ ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা—সব দিকেই নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এ বছরের ডিসেম্বরে প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একইভাবে দ্বিতীয় ইউনিটের সূচিও অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে।
প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর নতুন প্রস্তাবে আরো ২৬ হাজার ১৮১ কোটি টাকা যোগ করা হয়েছে। এতে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে এক লাখ ৩৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা—যা মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে।
নভেম্বরের শুরুতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় প্রথম সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় প্রায় ১৩ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। পরে ১১ নভেম্বরের পিইসি সভায় বলা হয়, ডলারের বিনিময় হার সঠিকভাবে গণনায় আসেনি। পুনর্মূল্যায়নের পর ২৭ নভেম্বর নতুন ব্যয় পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়।
২০১৬ সালের অনুমোদিত প্রকল্পে ব্যয় ছিল এক লাখ ১৩ হাজার ৯২.৯১ কোটি টাকা। যদিও রাশিয়ার ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ডলারের হিসেবে অপরিবর্তিত, টাকার অঙ্কে তা এখন এক লাখ ১৬ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। নতুন ডিপিএ হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ডলার মূল্য ধরা হয়েছে ৯৫.২৮ টাকা এবং পরের তিন বছরের জন্য ১২২ টাকা।
বাংলাদেশ ও রাশিয়ার আন্ত সরকার চুক্তি অনুযায়ী দুটি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ইউনিট নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, প্রশিক্ষণ ও জ্বালানি ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রথম সংশোধিত প্রস্তাবে ইউনিট-১ কে ২০২৬ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে নেওয়ার কথা বলা হলেও নতুন সময়সূচিতে ইউনিট-২ এও দেরি হবে।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, ব্যয়ের ভুল হিসাব ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যয়, আর্থিক বিশ্লেষণ এবং আয়-ব্যয় নির্ধারণে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে। পিইসি সভায় রক্ষণাবেক্ষণ, পূর্তকাজ ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কোড নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
যুদ্ধ ও মহামারির কারণে রাশিয়ার ঋণ বিতরণ বিলম্বিত হয়েছে। বাকি ৩.৬৮ বিলিয়ন ডলার ২০২৬ সালের মধ্যে পাওয়ার আশা রয়েছে। ঋণ পরিশোধ শুরু হবে ২০২৯ সালের মার্চে, ২০ বছরে দুই কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে। কোনো কিস্তি দেরিতে পরিশোধ হলে বার্ষিক ১৫০ শতাংশ সুদ দিতে হবে।
প্রথম ইউনিটের ডিসেম্বরে উৎপাদন শুরু অনিশ্চিত। আইএমইডির প্রতিবেদনে দুই ইউনিটের নতুন সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ রয়েছে। অসমাপ্ত কাজের তালিকা প্রকল্প দপ্তর দিতে পারেনি। অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, টাকার অবমূল্যায়নসহ নানা কারণে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন খরচ প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্প তিন বছর পিছিয়ে যাওয়ার ফলে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে, স্থাপিত যন্ত্রপাতির আয়ু কমছে এবং জনবলের ব্যয় বাড়ছে। তাঁর মতে, সব দিক মিলিয়ে প্রকল্পের অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়ছে।
টিএসএন
