মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র ওঠানামার প্রেক্ষাপটে ভারতের মুদ্রা রুপি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক পদক্ষেপের পর ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিশেষ করে মুদ্রা ও জ্বালানি বাজারে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সোমবার আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপির দর এক পর্যায়ে নেমে আসে ৯৫ দশমিক ২২-এ, যা এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দিনের শুরুতে রুপি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল এবং লেনদেন শুরু হয় ৯৩ দশমিক ৬২ স্তরে। স্বল্প সময়ের জন্য এটি ৯৩ দশমিক ৫৭ পর্যন্ত কিছুটা শক্তিশালী হলেও দ্রুতই বাজারে বিক্রয়চাপ বৃদ্ধি পায়। দিনের শেষ ভাগে বড় ধরনের পতন ঘটে এবং রুপি ইতিহাসের নতুন নিম্নসীমায় পৌঁছে যায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পতনের পেছনে একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিস্তারের আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৫ ডলারে পৌঁছায়। যেহেতু ভারত একটি বড় জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ, তাই তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
দ্বিতীয়ত, নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মার্কিন ডলারের চাহিদা বিশ্বজুড়ে বেড়ে গেছে। এর ফলে ডলার সূচক ১০০-এর ওপরে অবস্থান করছে, যা উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রাগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। তৃতীয়ত, বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়িয়ে ভারতের শেয়ারবাজার থেকে পুঁজি প্রত্যাহার করছেন, যার ফলে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে।
নিচে বাজার পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র উপস্থাপন করা হলো—
| সূচক/বিষয় | সর্বোচ্চ/শুরু | সর্বনিম্ন/শেষ | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| রুপি (ডলার প্রতি) | ৯৩.৬২ | ৯৫.২২ | উল্লেখযোগ্য পতন |
| শুরুর লেনদেন স্তর | ৯৩.৫৭ | — | অস্থিরতা বৃদ্ধি |
| সেনসেক্স | — | প্রায় ১,৭০০ পয়েন্ট কমে | বড় পতন |
| নিফটি | — | ৫০০ পয়েন্টের বেশি কমে | উল্লেখযোগ্য পতন |
| অপরিশোধিত তেল (ব্রেন্ট) | — | প্রায় ১১৫ ডলার প্রতি ব্যারেল | ঊর্ধ্বমুখী চাপ |
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে রুপির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে ভারতের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি শক্তিশালী ডলারের প্রভাব উন্নয়নশীল দেশের মুদ্রাগুলোর স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি মুদ্রার পতন নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার একটি বড় প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে ভূরাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং পুঁজি প্রবাহ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে।
