গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী বা ‘জুলাইযোদ্ধা’ সুরভীকে বিতর্কিত অভিযোগে গ্রেপ্তার, তাঁর বয়স নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে রিমান্ড আবেদনের ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন আদালত। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে চরম গাফিলতি ও অপেশাদারিত্বের অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) গাজীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সৈয়দ ফজলুল মাহদী এই আদেশ প্রদান করেন। কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার নাসির উদ্দিন আদালতের এই নির্দেশনা প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ঘটনার পটভূমি ও আইনি বিতর্ক
গত ২৫ ডিসেম্বর সুরভীকে চাঁদাবাজিসহ একাধিক অভিযোগে গ্রেপ্তার করে কালিয়াকৈর থানা পুলিশ। ২৮ ডিসেম্বর তাঁর জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর, ২৯ ডিসেম্বর তদন্তকারী কর্মকর্তা ওমর ফারুক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। ৫ জানুয়ারি শুনানির পর আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন। তবে ঠিক সেই সময়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুরভীর একটি জন্মসনদ ছড়িয়ে পড়লে তাঁর বয়স নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়। নথিপত্র অনুযায়ী সুরভী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও পুলিশ তা বিবেচনায় না নিয়ে সাধারণ রিমান্ড আবেদন করায় বিষয়টি আদালতের নজরে আসে।
ঘটনার প্রধান ঘটনাক্রম এবং আইনি পদক্ষেপের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
সুরভী গ্রেপ্তার ও তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থার খতিয়ান
| তারিখ ও পর্যায় | বিস্তারিত ঘটনা ও আদালতের সিদ্ধান্ত |
| গ্রেপ্তার | ২৫ ডিসেম্বর, চাঁদাবাজির অভিযোগে সুরভীকে আটক। |
| রিমান্ড আবেদন | ২৯ ডিসেম্বর, তদন্ত কর্মকর্তা ওমর ফারুক কর্তৃক ৫ দিনের আবেদন। |
| নিম্ন আদালতের আদেশ | ৫ জানুয়ারি সকালে সুরভীর ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর। |
| রিভিশন ও জামিন | ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রিমান্ড বাতিল ও ৪ সপ্তাহের অন্তর্বর্তী জামিন। |
| আদালতের পর্যবেক্ষণ | তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ। |
| বিভাগীয় নির্দেশ | ৮ জানুয়ারি, ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এসপিকে নির্দেশ। |
| অনুলিপি প্রেরণ | এসপি গাজীপুর ও এএসপি কালিয়াকৈর সার্কেল বরাবর। |
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও ন্যায়বিচার
সুরভীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাশেদ খান রিমান্ড আদেশের বিরুদ্ধে দ্রুত রিভিশন আবেদন করলে ভারপ্রাপ্ত জেলা জজ অমিত কুমার দে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত সুরভীর রিমান্ড বাতিল করেন এবং পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি লক্ষ্য করেন। আদালত তাঁর আদেশে উল্লেখ করেন যে, আসামির বয়স এবং আইনি সুরক্ষার বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই না করে রিমান্ড চাওয়া রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলার শামিল। এর পরেই তদন্তকারী কর্মকর্তা ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও সামাজিক প্রভাব
ইতিমধ্যেই আদালতের আদেশের অনুলিপি গাজীপুরের পুলিশ সুপার এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের একজন সম্মুখসারির কর্মীর প্রতি পুলিশের এমন আচরণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার ত্রুটি নিয়ে সচেতন মহলে তীব্র সমালোচনা চলছিল। আদালতের এই সাহসী হস্তক্ষেপ এবং তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নির্দেশ ন্যায়বিচারের পথকে সুগম করেছে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। পুলিশ প্রশাসন এখন আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী বিভাগীয় তদন্ত শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
