রিজার্ভ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪ বিলিয়ন ডলার ক্রয়

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং ডলারের তারল্য ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বাজার থেকে সব মিলিয়ে ৩.৯৩ বিলিয়ন (৩৯৩ কোটি) মার্কিন ডলার ক্রয় করেছে। দীর্ঘ কয়েক বছরের ডলার সংকটের পর বাজারে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়া এবং টাকার মান শক্তিশালী হওয়ার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

ডলার ক্রয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আজকেও পাঁচটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৫৫ মিলিয়ন (৫ কোটি ৫০ লাখ) ডলার ক্রয় করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। প্রতি ডলার ১২২.৩০ টাকা দরে এই লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, যা আজকের জন্য ‘কাট-অফ রেট’ হিসেবে নির্ধারিত ছিল। কেবল জানুয়ারি মাসেই এখন পর্যন্ত বাজার থেকে ৭৯৮ মিলিয়ন (৭৯ কোটি ৮০ লাখ) ডলার সংগ্রহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রপ্তানি আয় এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের উচ্চ প্রবাহের কারণেই বাজারে ডলারের এই বাড়তি সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার ক্রয়ের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

সারণি: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডলার ক্রয় ও রিজার্ভের চিত্র

বিষয়ের বিবরণতথ্য ও পরিসংখ্যান
মোট ডলার ক্রয় (জুলাই ‘২৫ – জানুয়ারি ‘২৬)৩.৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
জানুয়ারি ২০২৬-এ ক্রয় (এখন পর্যন্ত)৭৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
সর্বশেষ লেনদেনের বিনিময় হার১২২.৩০ টাকা (প্রতি ডলার)
মোট বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ (২২ জানুয়ারি)৩২.৬৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
বিপিএম৬ (BPM6) পদ্ধতিতে রিজার্ভ২৮.০৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

সংকট কাটিয়ে স্থিতিশীলতার পথে অর্থনীতি

গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে জ্বালানি তেল, সার এবং খাদ্যশস্যের আমদানির ব্যয় মেটাতে বাজারকে সহায়তা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রি করেছিল। তবে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই চিত্রটি পাল্টেছে। বৈদেশিক মুদ্রার অন্তঃপ্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় জুলাই মাস থেকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকা ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হচ্ছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ডলারের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন ডলার বিক্রিতে আগ্রহী হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিয়মিত বাজার থেকে ডলার কিনে নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বা রিজার্ভ পুনরায় সমৃদ্ধ করছে। ২২ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে, দেশের গ্রস রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.৬৬ বিলিয়ন ডলারে। যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘বিপিএম৬’ পদ্ধতি অনুযায়ী এই হিসাব ২৮.০৬ বিলিয়ন ডলার।

আমদানিকারক ও সাধারণ মানুষের স্বস্তি

ডলারের সংকট কেটে যাওয়ায় আমদানিকারকদের এলসি (LC) বা ঋণপত্র খুলতে আগের মতো বেগ পেতে হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্য আমদানির পথ সুগম হওয়ায় শিল্পোৎপাদন ও সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ধারাবাহিক ডলার ক্রয় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা রোধে বাফার হিসেবে কাজ করবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের এই প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরের শেষ নাগাদ দেশের রিজার্ভ আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজারের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং টাকার মান যেন অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি না পায়, সেজন্যই বাজার থেকে অতিরিক্ত ডলার তুলে নেওয়া হচ্ছে। এতে করে রপ্তানিকারকরাও লাভবান হচ্ছেন।