রাশিয়ার তেল প্রশ্নে ভারতের নীরবতা

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দিলেও, রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধের বিষয়ে ভারত এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায়নি—এমনটাই দাবি করেছে মস্কো। ট্রাম্পের বক্তব্যে বলা হয়, চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ করবে এবং পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও সম্ভাব্যভাবে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কিনবে। এর বিনিময়ে ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্কহার ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা জানান তিনি। তবে এই দাবির সঙ্গে ভারত সরকারের সরাসরি কোনো ঘোষণা না থাকায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকোভ মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) স্পষ্ট করে বলেন, রাশিয়া এ বিষয়ে নয়াদিল্লির কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা বা বিবৃতি পায়নি। তাঁর ভাষায়, “আমরা ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সম্মান জানাই। তবে রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের উন্নত কৌশলগত অংশীদারত্ব আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়াই আমাদের অগ্রাধিকার।” পেসকোভ আরও বলেন, দিল্লির সঙ্গে জ্বালানি, বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে মস্কো আগ্রহী।

বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই চুক্তির কথা ঘোষণা করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ভারত রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে এবং এতে ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে, যা যুদ্ধ বন্ধে সহায়ক হতে পারে। তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার তেল বর্জনের মাধ্যমে প্রতিদিন ও প্রতি সপ্তাহে প্রাণহানির সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে—যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো বিস্তারিত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

ট্রাম্পের ঘোষণার কয়েক মিনিট পর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিবৃতি দেন। সেখানে তিনি ট্রাম্পকে ১৪০ কোটি ভারতীয়র পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানান। তবে ওই বিবৃতিতে রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ বা নতুন জ্বালানি উৎসে সরে যাওয়ার বিষয়ে কোনো সরাসরি মন্তব্য ছিল না। ফলে বিষয়টি নিয়ে দিল্লির অবস্থান এখনো অস্পষ্টই রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা বহুমাত্রিক। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া এবং অন্যান্য উৎস থেকে তেল আমদানি করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাড়মূল্যে রুশ তেল আমদানি বাড়ালেও, ভারত একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভরশীল নয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের চাপও রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, হঠাৎ করে রাশিয়ার তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবায়নযোগ্য কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

নিচের সারণিতে ভারতের সাম্প্রতিক জ্বালানি আমদানির সাধারণ চিত্র তুলে ধরা হলো (আনুমানিক ও প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে):

উৎস দেশ/অঞ্চলমোট আমদানিতে অংশ (%)মন্তব্য
রাশিয়া৩০–৩৫ছাড়মূল্যের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃদ্ধি
মধ্যপ্রাচ্য (সৌদি, ইরাক ইত্যাদি)৪০–৪৫দীর্ঘদিনের প্রধান সরবরাহকারী
যুক্তরাষ্ট্র৫–৭এলএনজি ও ক্রুড উভয় ক্ষেত্রেই বৃদ্ধি
অন্যান্য (আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা)১০–১৫উৎস বৈচিত্র্যকরণ কৌশলের অংশ

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ঘোষণার রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকলেও বাস্তব নীতিগত পরিবর্তন এখনো স্পষ্ট নয়। রাশিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বিষয়টি অনুমান ও কূটনৈতিক কথাবার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। দিল্লি যদি ভবিষ্যতে কোনো পরিবর্তিত অবস্থান জানায়, তবে তা শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়—ভূরাজনীতিতেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।