রাজনৈতিক ইশতেহারে সংখ্যালঘুদের অধিকার উপেক্ষিত: হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। আজ শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ এই গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ইশতেহারে নেই সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতির খতিয়ান বা ইশতেহার জনগণের সামনে পেশ করেছে। তবে ঐক্য পরিষদের দাবি, এসব ইশতেহারে সংখ্যালঘুদের দীর্ঘদিনের দাবিদাওয়া—যেমন সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন বা দেবোত্তর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার আইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর এই “নির্মম উপেক্ষা ও অবহেলা” সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র হতাশা সৃষ্টি করেছে। পরিষদের মতে, সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারের অভাব ভবিষ্যতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদি নির্বাচনের ফলাফলে এই ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটে, তবে তার জন্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।


রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও সংখ্যালঘু প্রেক্ষাপট

বিষয়বিবরণ ও পর্যবেক্ষণ
বর্তমান প্রেক্ষাপট১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
প্রধান অভিযোগনির্বাচনী ইশতেহারে সংখ্যালঘু স্বার্থের সামগ্রিক উপেক্ষা।
বিতর্কিত বক্তব্যআল-জাজিরায় বিএনপি মহাসচিবের দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা।
প্রধান দাবিনিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি সাংবিধানিক ও আইনি সুরক্ষা।
ঐক্য পরিষদের অবস্থানকেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে আস্থা নেই, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ।

বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা

বিবৃতিতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারের কঠোর সমালোচনা করা হয়। মনীন্দ্র কুমার নাথ দাবি করেন, সাক্ষাৎকারে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে নিছক ‘রাজনৈতিক বিষয়’ হিসেবে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

ঐক্য পরিষদের মতে, সাম্প্রদায়িক হামলাকে রাজনৈতিক সংঘর্ষ হিসেবে চিত্রায়িত করা হলে প্রকৃত বিচার বাধাগ্রস্ত হয় এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। দীর্ঘকাল ধরে চলা নিপীড়নকে এভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে ঘটনার ভয়াবহতাকে আড়াল করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে ক্ষোভ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করা হয়।

আস্থার সংকট ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনী প্রচারণার সময় রাজনৈতিক দলগুলো মৌখিকভাবে নিরাপত্তার অভয় দিলেও তা সংখ্যালঘু জনমনে কোনোভাবেই আস্থা ও আশা জাগাতে পারছে না। অতীতেও নির্বাচনের আগে এবং পরে সংখ্যালঘু পল্লীগুলোতে যেভাবে সহিংসতা হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে এবারের ইশতেহারগুলোতে জোরালো সুরক্ষার অভাব তাদের শঙ্কিত করে তুলেছে।

পরিষদ মনে করে, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ছিল প্রতিটি সংখ্যালঘু পরিবারের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি রূপরেখা ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা। মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিকার আদায়ের নিশ্চয়তা পেলেই কেবল সাধারণ সংখ্যালঘুরা নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ খুঁজে পাবে।

পরিশেষে, বিবৃতিতে সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানানো হয় যেন তারা তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্বিবেচনা করে এবং সংখ্যালঘু বান্ধব একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।