রাজধানীতে চাঁদাবাজ দমনে বিশেষ অভিযান

রাজধানীতে চাঁদাবাজি, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও দাগী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে নতুন করে একটি বিস্তৃত তালিকা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করেছে মহানগর পুলিশ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তালিকাটি বর্তমানে যাচাই–বাছাই পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শিগগিরই অভিযানের কৌশল নির্ধারণ করে মাঠপর্যায়ে অভিযান শুরু করা হবে। রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে এই উদ্যোগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

মহানগর পুলিশের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযানের পরিকল্পনা এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যাতে কোনোভাবেই তা ব্যর্থ না হয়। এজন্য অপরাধীদের অবস্থান, কার্যক্রমের ধরন এবং তাদের সহযোগী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশেষ করে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রাজধানীর পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এ অভিযান প্রথমে রাজধানী থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে বিস্তৃত করা হবে। তাঁর মতে, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা ও স্বস্তির অনুভূতি ফিরে আসবে।

মহানগর পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তুত তালিকায় শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত ১৪০ জন চাঁদাবাজের নাম রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন ও বাজারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির অভিযোগের ভিত্তিতে এসব নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কাওরান বাজার, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় চাঁদাবাজদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে পুলিশ সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিচের সারণিতে রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চিহ্নিত চাঁদাবাজদের আনুমানিক উপস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হলো—

এলাকাচিহ্নিত চাঁদাবাজের আনুমানিক সংখ্যাপ্রধান অভিযোগের ধরন
কাওরান বাজারপ্রায় ৩৫ জনবাজার ও পাইকারি ব্যবসায় চাঁদা আদায়
মোহাম্মদপুরপ্রায় ৩০ জননির্মাণকাজ ও স্থানীয় ব্যবসায় চাঁদা
মিরপুরপ্রায় ৪০ জনপরিবহন ও দোকানপাট থেকে চাঁদা
পল্লবীপ্রায় ২৫ জনবাজার ও আবাসিক এলাকায় চাঁদাবাজি
অন্যান্য এলাকাপ্রায় ১০ জনবিভিন্ন ধরনের চাঁদা আদায়

মহানগর পুলিশের বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের নাম, ঠিকানা এবং অপরাধের ধরনসহ বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন। পরবর্তীতে সেগুলো যাচাই করে মহানগর পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলেই অভিযান শুরু করা হবে।

একজন থানাপ্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, থানার তদন্ত কর্মকর্তাদের ইতোমধ্যে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের চলাফেরা ও কার্যকলাপ সম্পর্কে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে, যাতে অভিযান শুরু হলে দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করা যায়।

অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের সর্বোচ্চ গুরুত্ব রয়েছে। নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই স্বরাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট প্রধানদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন।

তিনি আরও জানান, প্রথম পর্যায়ে রাজধানীতে তালিকাভুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হবে। পরে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিশেষভাবে চিহ্নিত এলাকায় একই ধরনের তালিকা প্রস্তুত করে অভিযান চালানো হবে।

স্বরাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে যেন কোনো পক্ষপাতিত্ব না থাকে এবং নিরপেক্ষভাবে প্রকৃত অপরাধীদেরই চিহ্নিত করা হয়। তিনি জনগণের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জনগণ ও পুলিশের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।

সরকারের লক্ষ্য হলো দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অপরাধ দমন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা ও স্বস্তির পরিবেশ নিশ্চিত করা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পরিকল্পিত এই অভিযান সফল হলে রাজধানীর অপরাধ পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।