রাগের আভা ও অনুরাগের ছোঁয়া সত্য সাহা

বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গীত জগতে তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই আবেগ, ঐতিহ্য ও সময়ের গন্ধ ভেসে আসে—সত্য সাহা। একাধারে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তিনি কয়েক দশক ধরে বাঙালির সঙ্গীতচেতনা ও অনুভূতির ভাষা গড়ে তুলেছেন।

সত্য সাহা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ফতেয়াবাদ গ্রামে। তাঁর পিতা প্রসন্নকুমার সাহা ছিলেন সঙ্গীতপ্রেমী এবং রবীন্দ্রসংগীতে পারদর্শী। পিতৃব্যবস্থাতেই সত্য সাহার সংগীতচর্চার বীজ রোপিত হয়। ১৯৪৬ সালে নারায়ণ হাই স্কুলে অধ্যয়নকালে তিনি পণ্ডিত সুপর্ণা নন্দীর তত্ত্বাবধানে উচ্চাঙ্গসংগীত শিখতে শুরু করেন। সেই সময় ভজন ও শাস্ত্রীয় গানে তাঁর দক্ষতা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে তাঁর সুরে এক আলাদা গভীরতা যোগ করে।

১৯৫৬ সালে বাংলাদেশ বেতারে সুরকার পঞ্চানন মিত্রের সহকারী হিসেবে তাঁর আনুষ্ঠানিক সঙ্গীতজীবন শুরু হয়। ১৯৬১ সালে তিনি বেতার শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে, কিন্তু সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে অভিষেক ঘটে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ১৯৬৪ সালের ‘সুতরাং’ ছবিতে। ছবিটির গান—“তুমি আসবে বলে, ভালোবাসবে বলে”—আজও বাংলা চলচ্চিত্র সংগীতের অমর সৃষ্টি হিসেবে পরিচিত।

সত্য সাহা সৃজনশীলতার বিস্তৃত পরিসরে কাজ করেছেন কলকাতা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নির্মিত ‘রূপবান’ চলচ্চিত্রে, যা প্রথমে সাদাকালো, পরে রঙিন হয়। তাঁর সঙ্গীত পরিচালনায় নির্মিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—

বছরচলচ্চিত্রপরিচালকউল্লেখযোগ্য তথ্য
১৯৬৪সুতরাংসুভাষ দত্তচলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে অভিষেক
১৯৬৫জানাজানিপ্রথম ছবি, পরে মুক্তি পায়
১৯৬৮রূপবানলোকজ সংস্কৃতির চলচ্চিত্র, সাদাকালো ও রঙিন উভয় সংস্করণে
১৯৭০কাগজের নৌকাসুভাষ দত্তবাঙালি শিশু ও কিশোরদের প্রিয় গানসম্ভার
১৯৭৪ফির মিলেঙ্গি হাম দুনোসৈয়দ শামসুল হকজনপ্রিয় গান ও সঙ্গীত পরিচালনা
১৯৮০-৮৫অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টারমলা সাহাদর্শকপ্রিয়তা অর্জন, চলচ্চিত্র সংকটকালেও আলোড়ন সৃষ্টি

১৯৬৪ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২০০-এর বেশি চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন এবং ২০টি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন। তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৪ সালে বাচসাস পুরস্কার এবং ১৯৯৪ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

সত্য সাহা ১৯৯৯ সালের ২৭ জানুয়ারি কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর সুর, রাগে-অনুরাগে, ভালোবাসা ও বেদনায় আজও বাঙালির হৃদয়ে নীরবে বেঁচে আছে।